অস্থিরতার শঙ্কায় স্থবির অর্থ-বাণিজ্য
- আপলোড তারিখঃ
২১-১০-২০১৮
ইং
ডেস্ক রিপোর্ট: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কায় অর্থ-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে। ভাটার টান ধরেছে পুঁজিবাজারসহ অর্থনীতির প্রায় সব অঙ্গনেই। বিত্তশালীদের অনেকে তাদের বৈধ-অবৈধ অর্থের বড় একটি অংশ ভুয়া এলসি ও ওভার ইন-ভয়েসসহ নানা উপায়ে বিদেশে পাচার করছেন। উদ্বিগ্ন স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের সঞ্চিত সামান্য অর্থও কোথাও বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। ঝুঁকি এড়াতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনও সাময়িকভাবে গুটিয়ে নিচ্ছেন। এসব সংকটের চিত্র ব্যাংক লেনদেনের হিসাবে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দ্রুত এ সংকটের সমাধান না হলে দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে আসার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশ একটি স্থবির রাজনৈতিক ব্যবসায়িক চক্রে পড়েছে, যার পরিণতিতে আর্থিক কাঠামো ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমেছে। বিনিয়োগের সমস্যা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফ-ও (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত ১২ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার পর্যটননগরী বালিতে অনুষ্ঠিত ‘বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে এক বৈঠকে আইএমএফের ডিএমডি মিতসুহিরো ফুরুসাওয়া বাংলাদেশে আকস্মিক আমদানি এত বাড়ল কেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ কেন করা যাচ্ছে না, ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে কেন ব্যর্থ হচ্ছেÑ এসব প্রশ্ন নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে এই তিন ‘কেন’-এর উত্তর জানতে চেয়েছেন। এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, রাজনৈতিক সংকট শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের রাজনীতিতে যত বেশি অস্থিরতা সৃষ্টি হবে তত বেশি অর্থনীতিতে বিপর্যয় ঘটবে। আর এর কারণে প্রবৃদ্ধি কমে আসবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হবে। সেই সঙ্গে বেকারত্ব বাড়বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কায় দেশের অর্থনীতির আর্থিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ নির্বাচন। প্রতিটি দেশেই নির্বাচনের আগে অর্থনীতিতে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকে। তবে বাংলাদেশে এর প্রভাব অনেকটা বেশি। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে নানা উপায়ে অর্থপাচার বেড়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ভাষ্য, অর্থপাচার যে হচ্ছে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়াই তার প্রমাণ। বিশ্ববাজারে এখন ডলারের দাম কমতির দিকে। কিন্তু বাংলাদেশে ডলারের দাম বেড়েই চলেছে। তারা বলছেন, নির্বাচনের বছরে এমনটি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তার ধারণা, ‘নির্বাচনের বছরে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার বেড়ে যাওয়ার কারণে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে চলেছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় চলে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থ। অনেকে ভুয়া এলসি (ঋণপত্র) অথবা ওভার ইন-ভয়েসের মাধ্যমেও অর্থপাচার করছেন বিভিন্ন দেশে।’
এদিকে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস ঘুরে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা মাথায় রেখে অনেকেই আগেভাগেই শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে রাখছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারা পরে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন। এর ফলে শেয়ারবাজারে লেনদেনে নি¤œমুখী অবস্থা দেখা দিয়েছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কায় নতুন আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আনতে ভয় পাচ্ছেন নতুন তালিকাভুক্ত হতে চাওয়া কোম্পানিগুলো। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এই সময়ে আইপিও বাজারে এলে তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কতটা সাড়া ফেলবে, তা নিয়ে চিন্তিত তারা।
অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কায় দেশে বিনিয়োগেও এরই মধ্যে নেমে এসেছে একধরনের স্থবিরতা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে বিনিয়োগে সতর্ক উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে আমানতের সুদহার কমায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩১ মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। গত আগস্ট শেষে প্রবৃদ্ধি নেমেছে ১৪ দশমিক ৯৫ শতাংশে। আগের মাস জুলাইতে যা ছিল ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মূলত নির্বাচনের বছরে ব্যাংকগুলোর ঋণে লাগাম টানতে গত জানুয়ারিতে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানো এবং সুদ হার কমানোর সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক খাতে তারল্যের টানাটানি তৈরি হয়েছে। এতে করে কমছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি। যা অর্থনীতির জন্য ভালো খবর নয়। কেননা এ রকম প্রবণতা থাকলে কর্মসংস্থান কমবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানান, বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে তার সমাধান কী তা কেউ জানে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছেই। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে, তেমনি উদ্যোক্তারা বড় ধরনের বিনিয়োগে যেতে সাহস পাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় বিনিয়োগ করতে হলে রাজনৈতিক অনূকূল পরিবেশ লাগে। ঝুঁকি নিয়ে কেউ বড় ধরনের বিনিয়োগ করার সাহস পায় না। সরকার বার বার বলে আসছে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু সরকারের এমন আহবানেও ব্যবসায়ীরা বড় বিনিয়োগে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এতে করে দেশে যেমন বিনিয়োগ স্থিবিরতা নামছে, তেমনি বেকারত্বও বাড়ছে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার নানা সুযোগ সুবিধা দিলেও তা কাজে আসছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দুই পক্ষই অনড় অবস্থানে থাকলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে অর্থনীতিতে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ উদ্যোক্তারা অপেক্ষা করবেন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা বিবেচনার জন্য। পাশাপাশি পণ্য বাজারজাতকরণে পরিবহন সমস্যাসহ আরও অনেকগুলো সমস্যা দেখা দেবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইবে না। অন্যদিকে ভোক্তাদের দিক থেকেও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে চাহিদা কমে যাবে।
কমেন্ট বক্স