বঙ্গবন্ধুতে ভর্তি খালেদা জিয়া
- আপলোড তারিখঃ
০৭-১০-২০১৮
ইং
আদালতের নির্দেশ মোতাবেক ৫ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন
ডেস্ক রিপোর্ট: অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের পর অবশেষে আদালতের নির্দেশ মোতাবেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুর্নীতির দায়ে দ-প্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল শনিবার সেখানকার কেবিন ব্লুকের ৬১২ নম্বর কক্ষে তাকে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পরপরই খালেদা জিয়াকে দেখতে আসেন তার চিকিৎসায় পুনর্গঠন করা মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ডা. আবদুল জলিল চৌধুরী। আজ রবিবার বেলা ১টায় বৈঠকে বসবে মেডিকেল বোর্ড। এরপরই শুরু হবে কারাবন্দি বিএনপি নেত্রীর চিকিৎসা। খালেদা জিয়ার জন্য আদালতের নির্দেশে পুনর্গঠিত পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা হচ্ছেন- কার্ডিওলজির অধ্যাপক সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি, রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক, অর্থোপেডিক বিভাগের অধ্যাপক নকুল কুমার দত্ত, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী ও ফিজিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ। এর মধ্যে তিন জন খালেদা জিয়ার পছন্দ করা চিকিৎসক। বাকি দু’জন সরকার নিযুক্ত নিরপেক্ষ চিকিৎসক।
বিএসএমএমইউর পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ভর্তি করা হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালে আনার পর বোর্ডের প্রধান মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী তাকে দেখেছেন। আগামীকাল (আজ রবিবার) দুপুর ১টায় তারা বোর্ড মিটিং করবেন। বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলবে। আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারারক্ষী, আনসার সদস্য ও পুলিশের সমন্বয়ে নিরাপত্তা দেয়া হবে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে পরিবার, স্বজন বা গৃহপরিচারিকা কেউ থাকবেন কিনা- জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, কারাবিধি অনুযায়ী যা করার তাই করা হবে। কারাগারে তার সঙ্গে যারা ছিল, এখানেও তারা থাকবেন। এর আগে গতকাল শনিবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে কড়া প্রহরায় ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা জোনের একটি পেট্রোল কারে করে খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে আনা হয়। খালেদা জিয়া গাড়ি থেকে নেমে আস্তে আস্তে গেটের সামনে আগে থেকেই এনে রাখা হুইল চেয়ারে ওঠে বসেন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের কেবিন ব্লুকের ছয় তলায়। এ সময় খালেদা জিয়ার পরনে ছিল গোলাপি রঙের শাড়ি, চোখে কালো চশমা। গৃহকর্মী ফাতেমাও তার সঙ্গে ছিলেন।
এর আগে বেলা ৩টা ১১ মিনিটে খালেদাকে বহনকারী গাড়িটি কারাগার থেকে হাসপাতালের উদ্দেশে বের হয়। খালেদা জিয়া আসার আগেই তার ব্যবহার্য সামগ্রী নিয়ে একটি গাড়ি আসে হাসপাতালের গেটে। পরে সেগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে কেবিন ব্লুকে নিয়ে যাওয়া হয়। ৭৩ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে রাখার জন্য বিএসএমএমইউতে ৬১১ ও ৬১২নং কেবিন দুটি সকাল থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার বিষয় কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের সহযোগিতা চেয়েছিল। আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি। তারা আমাদের যেভাবে বলেছেন, আমরা সেভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। তাকে ভালোভাবেই হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছি। খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ আনার খবরে সেখানে তাৎক্ষণিক উপস্থিত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির শীর্ষ নেতা ও আইনজীবীরা। এ ছাড়াও খালেদা জিয়াকে দেখতে বিএসএমএমইউর সামনে জড়ো হন মহিলা দলসহ বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএসএমএমইউর সামনে উপস্থিত বিএনপির নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, এ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দলীয় নেতা ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া প্রমূখ।
অন্যদিকে, দলীয় প্রধানকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে, এমন খবরে দুপুর ১২টার পর থেকেইে প্রবল বৃষ্টি সত্ত্বেও সেখানে দলীয় নেত্রীকে এক পলক দেখার জন্য পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে ভিড় করতে থাকেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। পুলিশি ব্যারিকেডের কারণে কাছে আসতে না পারলেও তারা খালেদা জিয়ার নামে স্লোগান দিতে থাকেন। খালেদা জিয়া এসে পৌঁছলে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এক রকম জোর করেই দলের নেতাকর্মীদের বিএসএমএমইউ ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয় পুলিশ।
প্রসঙ্গত, গত ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে নেয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার দাবি জানান তার আইনজীবী ও দলীয় নেতারা। এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার পছন্দ ছিল বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল। তবে সরকার কারাবিধি অনুযায়ী তাকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার কথা জানায়। এ ক্ষেত্রে বিএসএমএমইউসহ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের প্রস্তাব দেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। কিন্তু এর কোনোটিতেই চিকিৎসা নিতে রাজি হননি তিনি। এ অবস্থায় এপ্রিল মাসের শুরুতে প্রথম তার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করে সরকার। গত ৭ এপ্রিল এই বিএসএমএমইউতেই নিয়ে এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় তার। তবে তখন গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও হাসপাতালে ভর্তি বিষয়টি গত ৬ মাস ধরেই আলোচনায় ছিল। এরপর গত ৯ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দাবিতে আদালতে একটি রিট আবেদন করা হয়। একইদিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির ৮ জন সিনিয়র নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে দেখা করে আবারো কারাবন্দি খালেদা জিয়ার পছন্দ অনুযায়ী রাজধানীর কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে তার চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানান। একইসঙ্গে মেডিকেল বোর্ড গঠনের অনুরোধও করেন। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে বিএসএমএমইউ।
তবে এ বোর্ডের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিএনপি থেকে বারবার প্রশ্ন তোলা হয়। আদালতে এ সংক্রান্ত রিটের শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা খালেদা জিয়ার সুষ্ঠু চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপর গত ৪ অক্টোবর আদালত সরকারপন্থি স্বাচিপ ও বিএনপিপন্থি ড্যাবের চিকিৎসকদের বাদ দিয়ে ওই তালিকায় থাকা দু’জন নিরপেক্ষ চিকিৎসক ও খালেদা জিয়ার পছন্দের তিন জন চিকিৎসককে নিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন। তবে বিশেষায়িত হাসপাতালের ক্ষেত্রে কারাবিধি ও খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিএসএমএমইউতেই তাকে দ্রুত ভর্তির নির্দেশ দেন আদালত। এ আদেশ অনুসারে নতুন করে মেডিকেল বোর্ড গঠনের পর গতকাল শনিবার খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়।
কমেন্ট বক্স