প্রায় ৪ কোটি টাকা আত্মসাত; দিনভর তদন্ত : অবশেষে আটক
- আপলোড তারিখঃ
২৫-০৯-২০১৮
ইং
মেহেরপুর অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার মাহমুদুল করিম শিমুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সোহেল রানা ডালিম: অভিনব কায়দায় প্রায় ৪ কোটি টাকা আত্মসাত করে আয়েশি জীবনযাপন করা মেহেরপুর অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার মাহামুদুল করিম শিমুল অবশেষে থানা হেফাজতে। কয়েক বছর ধরে আত্মসাত করা ব্যাংকের টাকায় নামে বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। টাকা আত্মসাতের ঘটনায় খুলনা থেকে আসা দুই সদস্যের তদন্ত টিম গতকাল সোমবার দিনভর মেহেরপুর ব্রাঞ্চে তদন্ত চালিয়েছেন। একই সাথে প্রকৃত টাকার অংক নির্ণয় করতে ঢাকা থেকে আসছে উচ্চ স্তরের আইটি টিম। এ ঘটনায় মেহেরপুর ব্যাঞ্চ ম্যানেজার বাদি হয়ে মামলা করলে গতকাল রাত ১০টার পর আটক করা হয় অভিযুক্ত ্যাশ অফিসার মাহামুদুল করিম শিমুলকে। ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা আত্মসাত করার কাথ স্বীকার করেছে দাবি পুলিশের। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানালেন অগ্রণী ব্যাংকের সহকারি মহা ব্যবস্থাপক (অঞ্চল প্রধান) গোলাম মোস্তফা।
জানা যায়, ব্যাংকের টাকা আত্মসাত করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হওয়া অগ্রণী ব্যাংক মেহেরপুর শাখার ক্যাশ অফিসার মাহামুদুল করিম শিমুল দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যাংকে ক্লিয়ারিং এর কাজ করে আসছিলো। ফলে বিভিন্ন ব্যাংকসহ ঢাকা হেড অফিসের সাথে যে মূল একাউন্ট নাম্বারে টাকা আদান প্রদান করা হতো, ওই নাম্বারে টাকা ঢুকলেই নিজ স্ত্রী ও শ্বশুরসহ বিভিন্ন একাউন্টে টাকা ঢুকিয়ে তুলে নিতেন তিনি। টেকনোলোজি জ্ঞান বেশি থাকাই এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৪ কোটি টাকা আত্মসাত করেছে সে। গড়েছেন নামে বেনামে সম্পদের পাহাড়।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, কিছুদিন পূর্বে ঢাকা হেড অফিসের এক আইটি অফিসার টাকা আত্মসাতের বিষয়টা বুঝতে পারলে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায়। ব্যাংকের ভিতর এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে তিনি দেড় কোটি টাকা ফেরত দিতেও রাজি হয়। পরে গতকাল ২০ লাখ টাকা ফেরত দেন তিনি। টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গতকাল সোমবার অগ্রণী ব্যাংকের বিভাগীয় সার্কেল অফিস খুলনা থেকে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি এসে দিনভর তদন্ত চালিয়েছেন মেহেরপুর ব্রাঞ্চে। প্রকৃত টাকার অংক নির্ণয় করতে না পারায় ঢাকা থেকে উচ্চস্তরের আইটি টিম এসে মোট টাকার পরিমাণটা নির্ণয় করবেন বলে জানায় সূত্র। এ ঘটনাই বর্তমান মেহেরপুর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মেহেদী মাসুদ বাদি হয়ে মেহেরপুর সদর থানায় মামলা করলে গতকাল রাতে তাকে আটক করে মেহেরপুর থানা পুলিশ। এসময় জিজ্ঞাসাবাদে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছে সে। আটক মাহমুদুল করিমকে আজ আদালতে প্রেরণ করা হবে বলে জানায় পুলিশ।
মেহেরপুর সদর থানার চাঁদপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে মাহামুদুল করিম শিমুল ২০১১ সালে অগ্রণী ব্যাংক মেহেরপুর শাখায় ক্যাশ অফিসার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। মাঝে এক বছর চুয়াডাঙ্গা জেলার আসমানখালি ব্রাঞ্চে কাজ করেন তিনি। পরে আবার ক্যাশ অফিসার হিসেবে ফিরে যান মেহেরপুরে। ক্যাশ অফিসার হলেও ব্যাংক ক্লিলিয়ারিং এর কাজ করতেন তিনি। এসময় মেহেরপুরে একটানা প্রায় ৪ বছর কাজ করেছে সে। ব্যাংকের ফাঁক ফোকড়সহ টেকনোলজি জ্ঞান বেশি থাকায় নিজ স্ত্রী-শ্বশুরসহ কয়েকজনের নামে টাকা ট্রান্সফার করে তুলে নিয়েছেন তিনি। এরপর গত এক বছর বামুন্দী ব্রাঞ্চে কাজ করছিলো সে।
লোকমুখে জানা যায়, ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে আয়েশি জীবনযাপন করা মাহামুদুল করিম শিমুলের সম্পদের পাড়ারের ফিরিস্ত-শ্বশুরবাড়ি এলাকা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের পাশে ৪ কাঠা জমির একটি প্লট কিনেছেন তিনি। যার আনুমানিক মূল্য অর্ধ কোটি টাকা। সেই জমিতে বানিয়েছেন ৫ তলার একটি বাড়ি। যার আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখেরও বেশি। তবে ৫ম তলার ছাদটি ঢালায়রত অবস্থায় আছে। মেহেরপুর সদর থানা এলাকায় চাঁদপুর গ্রামে রাস্তার পাশে কিনেছেন ৫ বিঘা জমি। যার দাম ১ কোটি টাকা। এই জমির ৩ বিঘা তার স্ত্রীর নামে। ২ বিঘা তার নামে। এছাড়াও গত এক মাস পূর্বে মেহেরপুর শহরে দোতলা বিশিষ্ট তানহা কসমেটিক্স নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিনেছেন তিনি। যার আনুমানিক মূল্য ৬৫ লাখ টাকা। কুষ্টিয়া শহরে শ্বশুরের সাথে পাথরের যৌথ ব্যবসায় দারুন পটু তিনি। আর এতো কিছু করেছেন তার বিপরীতে ব্যাংক থেকে নিয়েছেন মাত্র ৪৫ লাখ টাকা লোন।
মেহেরপুর সদর থানার (ওসি) ইনচার্জ রবিউল ইসলামের সাথে মুঠোফনে কথা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে সময়ের সমীকরণকে জানান, মেহেরপুর অগ্রণী ব্যাংকের ম্যানেজার মেহেদী মাসুদ টাকা আত্মসাতের বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করলে সদর থানা পুলিশের একটি টিম তাকে আটক করে। পরে আটককৃত আসামীকে থানা হেফাজতে নিলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সে স্বীকার করে। আজ তাকে আদালতে প্রেরণ করা হবে। একই সাথে আরো তথ্য উদঘাটনের জন্য রিমান্ডেরও আবেদন করা হতে পারে।
এদিকে, এ ঘটনায় অগ্রণী ব্যাংকের সহকারি মহাব্যবস্থাপক (অঞ্চল প্রধান) গোলাম মোস্তফা’র সাথে কথা হলে তিনি বলেন, মেহেরপুর ব্রাঞ্চের ক্যাশ অফিসারের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। গতকাল বিভাগীয় সার্কেল অফিস খুলনা থেকে দুই সদস্য বিশিষ্টর একটি তদন্ত টিম দিনভর মেহেরপুর ব্রাঞ্চে তদন্ত চালিয়েছে। একই সাথে প্রকৃত টাকার পরিমাণটা বের করতে ঢাকা থেকে উচ্চস্তরের আইটি টিম আসছে। তদন্তে দোষি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
কমেন্ট বক্স