আলমডাঙ্গা পৌরসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রতিবছর বাজেটকে কেন্দ্র করে উন্মুক্ত সভা, নাগরিকদের মতামত গ্রহণ ও আয়-ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে তুলে ধরার চর্চা থাকলেও এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। সাধারণ পৌরবাসীর অজান্তে বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদনের কাজ শেষ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি অর্থবছরের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও পৌরসভার ওয়েবসাইটে চলতি অর্থবছরের বাজেটের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পৌরসভার একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শেষ করা হয়েছে। সূত্রটির দাবি- বিষয়টি পৌরসভার সব কর্মচারী-কর্মকর্তা জানেন না পর্যন্ত। এ নিয়ে পৌরবাসীকে অবহিত করা হয়নি। করা হয়নি কোনো উন্মুক্ত বাজেট সভাও। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এবার বাজেট গোপনে করা হলো কেন? জনগণের অর্থে পরিচালিত পৌরসভার বাজেট জনগণের কাছ থেকে আড়াল করার কারণই বা কী?
পৌরবাসীর অভিযোগ, একটি পৌরসভার বাজেট শুধু দাপ্তরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। এর সঙ্গে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন ও সুযোগ-সুবিধা সরাসরি জড়িত। কোন সড়ক সংস্কার হবে, কোথায় ড্রেন নির্মাণ হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, পানি সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা কিংবা উন্নয়নমূলক কোন কাজ অগ্রাধিকার পাবেÑএসব সিদ্ধান্তের প্রতিফলন থাকে বাজেটে। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় নাগরিকদের মতামত নেওয়া এবং পরে বাজেটের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আলমডাঙ্গা পৌরসভার নিজস্ব ওয়েবসাইটে বাজেটের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ পৌরসভার ওয়েবসাইটে চলতি বছরের বিভিন্ন নোটিশ ও অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে ওয়েবসাইটে বাজেট না থাকার বিষয়টি নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
পৌরসভার একাধিক সূত্রের দাবি, বাজেট প্রণয়ন হয়ে থাকলে সেটির আয়-ব্যয়ের খাত, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বরাদ্দের তথ্য প্রকাশ করতে বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু কেন তা প্রকাশ করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পৌর এলাকার বাসিন্দা মাহবুব খান। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর বাজেট নিয়ে আলোচনা হতো, কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হচ্ছেÑএসব জানার সুযোগ থাকত। এবার বাজেট হয়েছে কি না, সেটিও আমরা পরিষ্কারভাবে জানি না। জনগণের টাকায় পৌরসভা চলে। সেই টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব জনগণ জানতে চাইতেই পারে।’
আরেক নাগরিক আশকার আলী বলেন, ‘আমাদের এলাকার রাস্তা, ড্রেন, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা রয়েছে। বাজেট করার সময় নাগরিকদের মতামত নেওয়া হলে এলাকার প্রয়োজনগুলো তুলে ধরা যেত। কিন্তু এবার উন্মুক্তভাবে বাজেট না করায় সাধারণ মানুষের কথা বলার সুযোগ হয়নি। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষের কেন এত গোপন করার প্রবণতা তা নিয়ে রহস্য রয়েছে।’
আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই পৌরসভার কিছু তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু তথ্য আসছে। গত আড়াই বছরে তারা প্রত্যেকে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। একজনের তো প্রাসাদোপম ৪টি বাড়ির ছবি ফেসবুকে দেখা গেছে। সাথে আরও কিছু জমি কেনার তথ্য। অর্থাৎ, পৌরসভায় চলছে সীমাহীন লুটপাট। সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই অবস্থায় গোপনে বাজেটের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে সচেতন পৌরবাসীকে। কার স্বার্থে উন্মুক্ত বাজেটের পরিবর্তে গোপন বাজেট? পৌর কর্তৃপক্ষের উচিত গোপনীয়তার পথ থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথে ফেরা।
আলমডাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, লুটপাটের জন্যই এ গোপন বাজেট। পৌরসভার বাজেট জনগণের অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। উন্মুক্ত বাজেটের মাধ্যমে নাগরিকদের মতামত নেওয়া হলে পৌরসভার প্রকৃত প্রয়োজনগুলো বাজেটে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ থাকে। এবার কেন এমন আয়োজন করা হলো না, পৌর কর্তৃপক্ষের সেটি পরিষ্কার করা উচিত।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শহিদুল কাউনাইন টিলু বলেন, বাজেট গোপন রাখার কোনো কারণ থাকতে পারে না। জনগণ জানতে চাইবে- কত টাকা আয় হবে, কত টাকা ব্যয় হবে এবং কোন খাতে ব্যয় হবে। বাজেট প্রকাশ না করা হলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে বাজেটের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা উচিত।
উন্মুক্ত বাজেটের মূল উদ্দেশ্য শুধু একটি সভা করা নয়; নাগরিকদের সামনে পৌরসভার সম্ভাব্য আয়-ব্যয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা এবং তাঁদের মতামত শোনা। এতে কোন এলাকার কোন সমস্যা বেশি জরুরি, কোন খাতে অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন এবং পৌরবাসীর প্রত্যাশা কীÑতা কর্তৃপক্ষের সামনে আসে। বাজেটে পৌরবাসীর সম্পৃক্ততার সৃষ্টি হয়।
একই সঙ্গে বাজেট প্রকাশ্যে উপস্থাপন করলে পৌরসভার আর্থিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ে। নাগরিকরাও জানতে পারেন তাঁদের দেওয়া কর ও অন্যান্য রাজস্ব কীভাবে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাছাড়া, তথ্য জানার অধিকারও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। ফলে একটি স্থানীয় সরকারের বাজেট সম্পর্কে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। বাজেট গোপন রাখলে বরং অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি হয়।
এ বিষয়ে জানতে আলমডাঙ্গা পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কবে প্রণয়ন ও অনুমোদন করা হয়েছে, এর মোট আয়-ব্যয় কত, উন্মুক্ত বাজেট সভা হয়েছে কি না এবং ওয়েবসাইটে বাজেট প্রকাশ না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য দিতে চাননি। এমনকি কত তারিখে বাজেট পাশ করা হয়েছে-শুধুমাত্র সেই তথ্যটিও জানাতে চাননি তিনি। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার এই নেতিবাচক মনোভাব বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।
আলমডাঙ্গা অফিস