চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার নেহালপুর ইউনিয়নে সার সংকট নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে কৃষকদের সার না পাওয়ার অভিযোগ উঠলেও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং কৃষি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এলাকায় সারের প্রকৃত কোনো বড় ঘাটতি নেই; বরং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার ব্যবহার, অতিরিক্ত উত্তোলন এবং প্রভাব খাটিয়ে সার সংগ্রহের প্রবণতার কারণেই কৃত্রিম সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নেহালপুর ইউনিয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানির হিজলগাড়ী ও ডিহি নামে দুটি বৃহৎ কৃষি খামার রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আখ চাষ করলেও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কয়েকশ একর জমি স্থানীয় কৃষকদের কাছে স্বল্পমেয়াদে লিজ দেওয়া হয়। এসব জমিতে কুমড়া, তরমুজ, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল ফসলের আবাদ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সরকারের কাছে পাঠানো সারের চাহিদাপত্রে কেরুর লিজকৃত জমির অতিরিক্ত চাহিদা সবসময় প্রতিফলিত হয় না। ফলে মৌসুমভিত্তিক চাষাবাদের সময় হঠাৎ করেই সারের চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে কুমড়া ও বিভিন্ন সবজি চাষে তুলনামূলক বেশি সার ব্যবহারের কারণে স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কেরুর লিজগ্রহীতাদের একটি অংশ স্বল্প সময়ে অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করেন এবং অতিরিক্ত সার উত্তোলনে রাজনৈতিক প্রভাবও ব্যবহার করেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক ফলনের আশায় অনেক কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করছেন। এতে সাময়িকভাবে ফলন কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির জৈবগুণ নষ্ট হয়, উর্বরতা হ্রাস পায় এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়নের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সার উত্তোলন করছেন। ফলে প্রকৃত কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছেন।
নেহালপুর ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলারের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুর নবী নিজের নামে কোনো আবাদি জমি না থাকলেও গত চার মাসে ৪১ বস্তা সার উত্তোলন করেছেন বলে তালিকায় উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টিএসপি ৮ বস্তা, ডিএপি ১২ বস্তা, এমওপি ৮ বস্তা এবং ইউরিয়া ১৩ বস্তা।
একইভাবে কেরুর লিজকৃত জমিতে চাষাবাদের কথা বলে হিজলগাড়ী গ্রামের শহিদুল ইসলাম এক মাসে ইউরিয়া ১৪ বস্তা, টিএসপি ৩ বস্তা, ডিএপি ২ বস্তা এবং এমওপি ৪ বস্তা উত্তোলন করেছেন বলে ডিলার সূত্রে জানা গেছে।
নলবিলা এলাকার শিমুল চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত মোট ৩৯ বস্তা সার উত্তোলন করেছেন বলে তালিকায় দেখা যায়। এর মধ্যে টিএসপি ১৫ বস্তা, ডিএপি ১২ বস্তা, এমওপি ৩ বস্তা এবং ইউরিয়া ৯ বস্তা রয়েছে।
অপরদিকে, বেগমপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলী হোসেন জোয়ার্দ্দারের নামে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত মোট ৫৯ বস্তা সার উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২১ বস্তা, টিএসপি ১৫ বস্তা, ডিএপি ১৬ বস্তা এবং এমওপি ৭ বস্তা রয়েছে।
অতিরিক্ত সার উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে নুর নবী বলেন, ‘আমার নিজের কোনো চাষ নেই। আমি কোনো সারও উত্তোলন করিনি।’ তবে সার ডিলারের কাছে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন, ‘যদি স্বাক্ষর থেকে থাকে, তাহলে হয়ত তুলেছি।’
শিমুল বলেন, ‘আমার নিজস্ব ১০ বিঘা এবং লিজকৃত প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফল ও ফসলের চাষ করি। আমি এত বস্তা সার উত্তোলন করিনি। শুধু এই মাসে একবার ৯ বস্তা এবং আরেকবার ২ বস্তা সার নিয়েছি।’ সাবেক চেয়ারম্যান আলী হোসেন জোয়ার্দ্দারও তার বিরুদ্ধে ওঠা অতিরিক্ত সার উত্তোলনের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সার বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিলার ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাবের মুখে অসহায় হয়ে পড়ছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাহিদামতো সার সরবরাহে অনীহা দেখালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয় এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়।
এ বিষয়ে নেহালপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওয়ার্ড ভিত্তিক নির্ধারিত তারিখে কৃষকদের আইডি কার্ডের ফটোকপি নিয়ে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সার বিতরণ করা হয়। কিন্তু কিছু ব্যক্তি লোক ভাড়া করে লাইনে দাঁড় করান। তাদের চাহিদামতো সার না দিলে তারা মব সৃষ্টি, রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন।’
কৃষি কর্মকর্তার এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে অভিযুক্ত কয়েকজনকে সার বিতরণ কেন্দ্রের সামনে কৃষি কর্মকর্তা ও ডিলারের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে দেখা যায়।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, যারা সবচেয়ে বেশি সারের সংকটের কথা বলছেন, তাদের মধ্যেই অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার সংগ্রহ করেছেন। এতে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। হিজলগাড়ী গ্রামের কৃষক মিলন হোসেন বলেন, ‘যেদিন সার উত্তোলনের তারিখ থাকে, সেদিন আমরা রোদে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করি। কিন্তু কিছু ব্যক্তি এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে।’
ডিহি গ্রামের কৃষক সাবাজুল বলেন, ‘আমরা বিঘাপ্রতি ২৫ কেজি ইউরিয়া সার পেলেও কিছু রাজনৈতিক নেতা জোর করে বস্তা বস্তা সার নিয়ে যান।’ নেহালপুর ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার রুবি খাতুন বলেন, ‘গুদামে সার মজুত থাকা সাপেক্ষে আমরা নিয়ম মেনে সার বিতরণ করি। তবে কিছু মানুষ প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত সার নেওয়ার চেষ্টা করেন।’
দর্শনা থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক খাইরুল আলম যুদ্ধ বলেন, ‘সার সংকটের অভিযোগ পেয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়েছি। জানতে পেরেছি, দলের কিছু ব্যক্তি নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত সার উত্তোলন করেছেন। এতে সাধারণ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নেহালপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার সংগ্রহ করে আবার এলাকায় সারের সংকটের কথা প্রচার করছেন বলে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দলীয়ভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে কেরুর লিজকৃত জমিতে কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলে তুলনামূলক বেশি সার ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া অনেক কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছেন, যা জমির জন্য ক্ষতিকর। কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারের বিষয়ে আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছি।’
এ বিষয়ে জানতে চুয়াডাঙ্গা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নয়ন কুমার রাজবংশী ফোন রিসিভ করেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে আমরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এছাড়া বিষয়টি আমরা স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখব। প্রকৃত চাষী ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তির সার উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই।’
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রকৃত কৃষকের হাতে সার পৌঁছে দিতে হলে অতিরিক্ত উত্তোলন ও অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে কেরুর লিজকৃত জমির প্রকৃত সারের চাহিদা সরকারি হিসাবের আওতায় আনা, রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, বিতরণ ব্যবস্থায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার বিকল্প নেই।
তাদের মতে, নেহালপুরে প্রকৃত সংকট সারের নয়; সংকট হলো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হতে থাকবেন এবং সরকারের কৃষিবান্ধব উদ্যোগের সুফলও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক