প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন ২১ ও ২২ জুন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এই দ্বিপাক্ষিক সফরে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। তার এই সফরের প্রধান এজেন্ডাগুলোর মধ্যে রয়েছে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা। মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির শ্রমবাজার নতুন করে কর্মী নেওয়া বন্ধ রেখেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি কার্যকর সমঝোতা বা ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসীরাও এই সফরকে কেন্দ্র করে নানাবিধ দাবি তুলে ধরেছেন।
সফরে দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষা ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়য়টি স্পষ্ট হয়। এছাড়াও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্য বৃদ্ধির নানা দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে। মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করবেন। ফলে তার এই এশীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের সূচনা আন্তর্জাতিক মহলে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়োগ সিন্ডিকেট বিলুপ্তির দাবি: প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের আগেই দেশটিতে শ্রমিক নিয়োগে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বিলুপ্ত এবং প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে অভিবাসী শ্রমিকদের সংগঠন মাইগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্ক (এমডব্লিউএন)।
সংগঠনটির দাবি, নিয়োগ সিন্ডিকেটের কারণে অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে এবং হাজারো শ্রমিক দাসত্ব ও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন। গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে এসব দাবি তুলে ধরেন এমডব্লিউএনের সচিব নিরঞ্জন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসন করিডোরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, শোষণ ও দুর্নীতি চলে আসছে। মালয়েশিয়া ১৪টি উৎস দেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগ করলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্বাচিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সীমিত ও সিন্ডিকেটনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। এই একচেটিয়া পদ্ধতি কৃত্রিমভাবে অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়েছে এবং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করেছে। নিরঞ্জন জানান, অনেক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যেতে প্রায় ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত কয় করতে বাধ্য হন, যেখানে সরকার নির্ধারিত হয় মাত্র ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকেই উচ্চ সুদে ঋণ নেন কিংবা পারিবারিক সম্পদ বন্ধক রাখতে বাধ্য হন।
সই হতে পারে সমঝোতা স্মারক ও নোট অব এক্সচেঞ্জ। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আগামী সপ্তাহে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের সফরে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। এই সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে ২১ থেকে ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারপ্রধান প্রথম বিদেশ সফরের উদ্দেশে আগামী রোববার (২১ জুন) বিকালে দেশটির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে তার। পরদিন সোমবার (২২ জুন) দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিম। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, মূলত মালয়েশিয়া সফরটা একদিনের হবে। ২২ জুন সফরের সব আনুষ্ঠানিকতা। একদিনের হলেও সফরটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হবে। সরকারপ্রধানের সফর বি-নমায় সবসময় ইতিবাচক। সফর হলে সম্পর্ক বাড়ে, কাজে গতি পায়। সফরটি ভালো হবে বলে আমরা আশা করছি। শ্রমবাজার আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। এছাড়া, ব্যবসা-বাণিজ্ঞ, জ্বালানি সহযোগিতার মতো বিষয় আছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি ইস্যু বেশ গুরত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়া সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কিছু বড় ব্যবসায়ী কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সাক্ষাতের কথা রয়েছে, সেই তালিকায় এনার্জি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী রয়েছেন। উল্লেখ্য, সাবেক অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের (২০২৫) আগস্টে মালয়েশিয়া সফর করেছিলন। সে সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক ও তিনটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হয়েছিল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বড় সুযোগ তৈরি হবে। প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরির কথা বলেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ আছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’ বিদেশে শ্রম বাজার সম্প্রসারণ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ প্রত্যাশার কথা জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে যত প্রত্যাশা। বিশ্লেষকদের মাতে, প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া একটি সুপরিকল্পিত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি, দি কিয়াং আনোয়ার য়ার ইব্রাহিম। তবে তাদের মধ্যে প্রথম গন্তব্য হিসেবে তিনি মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। ফলে মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে নিজেদের জন্য বেশ সম্মানের মনে করছেন।
তারা আশা করছেন এ সফরের মাধ্যমে তারেক রহমান মালয়েশিয়া সরকারের কাছ থেকে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা এনে দেবে। ব্যবসায়ীরা উভয় দেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে বলে মনে করেন। আর মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের প্রতীক্ষার অবসান হবে বলে তারা আশা করছেন। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ইস্যুটির সমাধানে মালয়েশিয়ার সর্বাত্মক সহযোগিতা পাবে বলেও অনেকে আশা করছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক:
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে ৫ বছরে ১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে মালয়েশিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বন্ধ শ্রমবাজারে আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর বেশ তাৎপর্য বহন করে। অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব কেবল পণ্য নয় শ্রম বিনিয়োগ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অগ্রগতি হবে। ফলে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো মালয়েশিয়ার পক্ষে ধনাত্মক। বাংলাদেশ প্রধানত তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য, পাটজাত সামগ্রী ও প্রক্রিয়াজাত খাদল মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করে। বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয় পাম অয়েল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, রাসায়নিক দ্রব্য, ইস্পাত ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী।
ঘাটতি কমানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রপ্তানি সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা:
সফরে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর উপায়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রপ্তনি সম্প্রসারণ নিয়ে আলেচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিষয়টি গুরত্ব পেতে পারে। দুই দেশের মধ্যে একটি ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ হায়োন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পথে। ফে ফলে ভবিষতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে আসতে পারে। এ অবস্থায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ বংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
সমীকরণ প্রতিবেদন