ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা শহিদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যার প্রতিবাদে চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, জীবননগর ও মেহেরপুরে বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও শোক কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, ছাত্র ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
চুয়াডাঙ্গা:
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে চুয়াডাঙ্গায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেলা দুইটায় জুমার নামাজের পর শহরের বড় বাজার শহিদ হাসান চত্বরে শিক্ষার্থী ও চুয়াডাঙ্গাবাসীর আয়োজনে এ সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলা সেক্রেটারি তুষার ইমরানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি হাসানুজ্জামান সজিব, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চুয়াডাঙ্গার মুখ্য সংগঠক সজিবুল ইসলাম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা সদস্যসচিব ফাহিম উদ্দিন মভিন, ওয়ারিয়র্স অব জুলাইয়ের চুয়াডাঙ্গা জেলার আহ্বায়ক মাহফুজ হোসেন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চুয়াডাঙ্গা জেলার সভাপতি সাগর আহাম্মেদ, আপ বাংলাদেশ চুয়াডাঙ্গার সভাপতি স্বপন আহমেদ ও ডাকসু হল সংসদের পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক ওয়াসির আল মাস্তুর।
বক্তারা বলেন, ‘হাদি শুধু একজন জুলাই যোদ্ধাই নয়, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আর দেশপ্রেমিকেরা কখনো মরে না। একজন জীবিত হাদি যতটা না শক্তিশালী ছিল, আজ এই মৃত হাদি তার থেকে হাজার গুন বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।’
সমাবেশ বক্তারা সরাসরি বিজিবির দিকে আঙুল তুলে বলেন, বর্ডারে যে বিজিবিরা কাজ করছে, তারা তাদের কাজ ঠিকভাবে করতেই পারলো না, তারা ব্যর্থ। তাদের উচিত বাংলাদেশ সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করা।
বক্তারা আরও বলেন, ‘শহিদ হাদি ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য সর্বপ্রথম দায়ী ভারত, তারপর দায়ী স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং আইন উপদেষ্টা। গোয়েন্দা সংস্থা এবং আপনারা যদি নাই জানতে পারেন হাদি ভাইয়ের ওপর হামলা হবে, তবে আপনাদের দরকারটা কি? আজকে হাদি ভাইয়ের ওপর হামলা হয়েছে, কাল হাসনাত, পরশু সারজিস, তারপর আমরা। এভাবেই কি জুলাই যোদ্ধারা শেষ হবে। ভারতীয় আগ্রাসন আমরা কেউ মানব না, আমরা রুখে দাঁড়াবো এই ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে। হাদি ভাইয়ের স্বপ্ন আমরা পূরণ করব। এক হাদির মৃত্যুতে হাজারো হাদি আজ জেগে উঠেছে।’ সমাবেশ শেষে হাসান চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে নানা রকম স্লোগানের সাথে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে আবার একই স্থানে এসে শেষ হয়। পরবর্তী তে শহিদ ওসমান হাদির মাগফিরাত কামনায় দোয়ার মধ্য দিয়ে সমাবেশ শেষ করা হয়।
আলমডাঙ্গা:
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির খুনিদের বিচারের দাবিতে গতকাল বিকেল ৪টায় বিক্ষোভ ও শোক মিছিল করেছে আলমডাঙ্গার ছাত্র-জনতা। তারা আল তায়েবা মোড় থেকে বিক্ষোভ শুরু করে ৭১ স্তম্ভ মোড় প্রদক্ষিণ শেষে আল তায়েবা মোড়ে এসে সমবেত হয়। এসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আলমডাঙ্গা উপজেলা শখার সাবেক আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক রাকিব মাহমুদের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন কামরুল হাসান কাজল, আরাফাত রহমান, তাওহিদ খান, শাকিব মাহমুদ ও অন্যান্য ছাত্রনেতা। এছাড়াও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসাবে এবি পার্টির মুসাব ইবনে শাফায়েত, এনসিপির পক্ষে সালেহিন কাউনাইন (সামাউন), গণঅধিকার পরিষদের খন্দকার মাশুক প্রমুখ। রাকিব মাহমুদ বলেন, ওসমান হাদির ওপর গুলি শুধু হাদীর উপর গুলি নয় বরং বাংলাদেশের বুকের উপর গুলি চালানো হয়েছে। অনতিবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে না পারায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তার পদে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে।
দর্শনা:
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে পরিকল্পিত হত্যার প্রতিবাদ এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে দর্শনায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজ শেষে দর্শনার ছাত্র-জনতা ও দেশপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে দর্শনা মুক্তমঞ্চে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মুক্তমঞ্চ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে দর্শনা বাসস্ট্যান্ড মহাসড়ক হয়ে চার রাস্তার মোড়ে বক চত্বরে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দেন দর্শনা পৌর জামায়াতের আমির সাইকুল ইসলাম অপু, বিএনপি ছাত্রদলের কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক পলাশ আহম্মেদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি রিফাত রহমান, তানজির রহমান অনিক, আজারুল ইসলাম সোহানসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তানজির রহমান অনিক।
বক্তারা বলেন, শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যা। অবিলম্বে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে বক্তারা ফ্যাসিবাদী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির দাবি জানান এবং ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
সমাবেশে “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা”, “আমি কে, তুমি কেÑহাদি হাদি”, “এক হাদি লাশান্তরে, কোটি হাদি ঘরে ঘরে” ইত্যাদি বলে স্লোগান দেওয়া হয়। পরে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে দর্শনা সীমান্তের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমান্তমুখী কর্মসূচি বাতিল করা হয়।
বক্তব্য শেষে দর্শনা বাসস্ট্যান্ড চৌরাস্তার মোড়ে নিহত শরীফ ওসমান হাদির মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। দোয়া পরিচালনা করেন দর্শনা জামে মসজিদের মুয়াজ্জেম ওসমান গনি। এছাড়াও দর্শনা পৌর এলাকার বিভিন্ন মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দর্শনা পরানপুর রিফিউজি কলোনি মসজিদে দোয়া পরিচালনা করেন হাফেজ মো. রবিউল ইসলাম।
জীবননগর:
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে জীবননগরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর জীবননগর বাসস্ট্যান্ডে সর্বদলীয় ব্যানারে এই বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
জীবননগর উপজেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আহ্বায়ক সোহেল পারভেজ, জুলাই আহত সহযোদ্ধা মুস্তাফিজুর, এনসিপি জীবননগর উপজেলা প্রধান সমন্বয়কারী ইমরান হোসেন, যুগ্ম সমন্বয়কারী রিদয় সরকার, শামিম দেওয়ান, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান, সদস্যসচিব রিমন, ইসলামী আন্দোলন জীবননগর উপজেলার সহসভাপতি মুফতি সাইফুল্লাহ, রাজু, খেলাফত মজলিশের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাওলানা জুবায়ের আল মাহমুদ, জীবননগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ইখলাছুর রহমান রাসেল, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী, জীবননগর ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি রিংকু, সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ প্রমুখ। বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলা কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ন্যায্য নির্বাচনের বিরুদ্ধে এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। যদি প্রশাসন ও রাষ্ট্র জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের দায়িত্ব ছেড়ে জনগণের কাতারে নেমে আসা উচিত। তারা আরও বলেন, শরিফ ওসমান হাদিকে বারবার হামলার হুমকি দেয়া হচ্ছিল। কিন্তু সরকার তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। হাদি ভাইয়ের শরীর থেকে যে রক্ত ঝরেছে, তা বৃথা যাবে না।
মেহেরপুর:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে মেহেরপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্লোগানে মুখরিত হয় শহরের রাজপথ। গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা মেহেরপুর মডেল মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে জুলাই ঐক্যের উদ্যোগে এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে কলেজ মোড়ের জুলাই স্মৃতিসৌধে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে বক্তারা শহিদ ওসমান হাদির হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেন এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানান।
মিছিলে উপস্থিত ছিলেন মেহেরপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাওলানা তাজ উদ্দিন খান, মেহেরপুর-২ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাকিল আহম্মেদ, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন, রাজনৈতিক সেক্রেটারি কাজী রুহুল আমিন, সদর উপজেলা আমির সোহেল রানা, পৌর আমির সোহেল রানা ডলারসহ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী।
মিছিলে ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘আমি কে তুমি কে, হাদি হাদি’সহ বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। বক্তারা বলেন, শহিদ ওসমান হাদি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অকুতোভয় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন। তাঁর হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সমীকরণ প্রতিবেদন