২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কিন্তু থেমে নেই মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তৎপরতা। দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রের হাইকমান্ডে চলছে তদবির। পাশাপাশি ঝিনাইদহের মাঠে কর্মসূচি, জনসংযোগ, সামাজিক কার্যক্রমে ব্যস্ত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও গণঅধিকার পরিষদের নেতারা।
জাতীয় ছুটি, দিবস কিংবা সপ্তাহান্তে সক্রিয় প্রার্থীরা ব্যানার-ফেস্টুন টানাচ্ছেন। অনলাইন প্রচারণাতেও সরগরম। তবে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জেলায় দৃশ্যমান কোনো শক্তিশালী নেতৃত্ব এখনো দাঁড় করাতে পারেনি।
জেলা সদরের চায়ের দোকান থেকে ইউনিয়নের আড্ডায় এখন আলোচনার মূল বিষয় আসন্ন ভোট। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ঝিনাইদহের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে ভোটাররা মনে করছেন।
ভোটারদের অভিমত—পেশীশক্তি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির রাজনীতিতে ক্লান্ত তারা। এবার নিরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে যোগ্য, সৎ ও ক্লিন ইমেজ প্রার্থীকে বেছে নিতে চান। সামাজিক কারণে মুখে না বললেও ব্যালট বাক্সে তাদের সিদ্ধান্ত হবে পরিষ্কার।
ঝিনাইদহের চারটি আসন
ঝিনাইদহ জেলার ছয় উপজেলা ও ছয় পৌরসভা মিলে গঠিত চারটি আসন হলো—ঝিনাইদহ-১ (শৈলকূপা), ঝিনাইদহ-২ (সদর আংশিক-হরিণাকুন্ডু), ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) ও ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ-সদর আংশিক)। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের আগে প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী জেলার মোট ভোটার ছিল ১৫ লাখ ১ হাজার ৩৮০ জন। এর মধ্যে শৈলকূপায় তিন লাখ ৬ হাজার ৩৩৬, সদর-হরিণাকুন্ডুতে চার লাখ ৭৬ হাজার ৩০০, কোটচাঁদপুর-মহেশপুরে চার লাখ তিন হাজার ২২৪ এবং কালীগঞ্জ-সদরের আংশিকে তিন লাখ ১৫ হাজার ৫২০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছিলেন ১২ জন। পরবর্তী হালনাগাদে ভোটার সংখ্যা আরও বেড়েছে।
সম্ভাব্য প্রার্থী যারা
ঝিনাইদহ-১ (শৈলকূপা): বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বাবু জয়ন্ত কুমার কুন্ডু। নিজস্ব কর্মী বাহিনী ও গ্রহণযোগ্য ইমেজে তিনি এগোতে চান। গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানও মনোনয়ন পেতে পারেন। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী উপজেলা আমির এএসএম মতিউর রহমান। ইসলামী আন্দোলনের উপজেলা সভাপতি লড়তে পারেন বলেও শোনা যাচ্ছে। তবে গণঅধিকার পরিষদ ও এনসিপি এ আসনে এখনো প্রার্থী দাঁড় করায়নি।
ঝিনাইদহ-২ (সদর-হরিণাকুণ্ডু): সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত। বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ মনোনয়ন চাইছেন। তবে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। স্থানীয়দের ধারণা, বিএনপি-গণঅধিকার জোট হলে রাশেদই প্রার্থী হতে পারেন।
জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জেলা আমির অধ্যাপক আলী আজম মোহাম্মদ আবু বকর। ইসলামী আন্দোলনের জেলা সভাপতি এইচএম মোমতাজুল করীমও সম্ভাব্য প্রার্থী।
ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর): এ আসনে জামায়াতের দাপট ঐতিহাসিক। এবারও দলটি আগেভাগে প্রার্থী ঘোষণা করেছে—অধ্যক্ষ মতিয়ার রহমান। ইসলামী বক্তা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে তার আলাদা পরিচিতি আছে।
বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান শিমুল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল ও কণ্ঠশিল্পী মনির খান। শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন যিনি পান, তার সঙ্গে লড়বেন জামায়াতের প্রার্থী।
ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ-সদর আংশিক): বিএনপির একাধিক প্রার্থী দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হামিদুল ইসলাম তৃণমূলে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। জামায়াত আগেই ঘোষণা দিয়েছে উপজেলা আমির মাওলানা আবু তালেবকে প্রার্থী হিসেবে। ইসলামী আন্দোলন থেকেও প্রার্থী আসতে পারেন। গণঅধিকার পরিষদে আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, যিনি জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছেন।
ভোটারদের মনোভাব
জেলার বিভিন্ন এলাকায় তিন শতাধিক ভোটারের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে তাদের প্রত্যাশা। তারা বলেন, শেখ হাসিনার সময়ে একাধিক নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। এবার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে চান। ভোটারদের বিশ্বাস—ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করবে। তারা বলছেন, এবার ক্লিন ইমেজের সৎ, যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীকে ভোট দেবেন। দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ ও প্রভাবশালী নেতাদের ব্যালটের মাধ্যমেই জবাব দেওয়া হবে। একজন ভোটার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিগত দিনে শুধু ভোট আর ভোট হয়েছে। নেতার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু দেশের কোনো বাস্তবিক উন্নতি হয়নি। এবার ব্যালটেই জবাব দেবো।’
সমীকরণ প্রতিবেদন