দেশের সব প্রজন্ম এখন মোবাইলে আসক্ত। এ নিয়ে সমাজ ও সংসারে মতবিরোধ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিনিয়ত সন্তানের সঙ্গে পিতামাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রাচীর উঠে ফাটল ধরাচ্ছে ভালোবাসার বন্ধনে। বিশেষ করে শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় পড়ালেখা লাটে উঠেছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর কনটেন্ট, আপত্তিকর ভিডিও, শিশুদের কার্টুন ও অনলাইন জুয়া শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনধারায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অভিভাবকদের এই দুশ্চিন্তার মধ্যে সুখবর নিয়ে এসেছেন ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার উদ্ভাবনী আইটি উদ্যোক্তা শাহিনুর রহমান। বানিয়েছেন শিশুদের মোবাইল ফোন আসক্তি রোধে কার্যকর এক সাড়া জাগানো অ্যাপস। যে অ্যাপস শুধু শিশু কিশোরদের নয়, সব বয়সী মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পরবে।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ‘চাইল্ড ফোন কন্ট্রোল’ নামে অ্যাপসটি তৈরি করেন হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ফলসি ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের শাহিন। মোটা বেতনের চাকরি ছেড়ে মানুষ ও দেশের কল্যাণে কাজ করার অদম্য স্পৃহা থেকে তিনি এখন বসবাস করছেন নিজ গ্রামে। ছোট্ট অফিস ও গ্রামের বাড়িতে বসেই তিনি অসাধ্যকে সাধন করে পেয়েছেন সফলতা।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কুলবাড়িয়া বাজারে ছোট একটি অফিস রয়েছে শাহিনের। কোনো ভিড় নেই, নেই হৈ-হুল্লোড়। গ্রামের নিভৃত্ত পল্লীতে বসে তিনি অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা মুক্ত করতে দারুণ এক অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপস তৈরি করেছেন। যে অ্যাপস দিয়ে সহজেই মোবাইল ফোনে চালু থাকা রিল ভিডিও, অনলাইন জুয়া, ফেসবুক ও ইউটিউবের আপত্তিকর ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, অ্যাপসটি দিয়ে শিশুরা কোন সাইট সার্চ করছে, কী কী ভিডিও বা কনটেন্ট দেখছে, তার সবই নজরদারি করা যাবে।
শাহিনুর রহমান জানান, শিশুদের মোবাইল ফোন আসক্তি রোধ করতে এই অ্যাপস দারুণ কার্যকর। যেকোনো অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনে এই অ্যাপসটি সফল ভাবে কাজ করতে পারে। অ্যাপসটি মোবাইল ফোনে ইনস্টল করা হলে, শিশুরা ফেসবুক ইউটিউব রিলস, শর্ট ভিডিও সহ কোনো ধরনের আপত্তিকর ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারবে না। অ্যাপসটি ফোনে সচল থাকলে শিশুরা ফেসবুক ইউটিউবে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে অটোমেটিক ফেসবুক ইউটিউব অ্যাপস বন্ধ হয়ে যাবে।
শাহিনের এমন উদ্ভাবনী অ্যাপসের খবর ছড়িয়ে পড়ায় অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এলেও স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে আলোচিত হয়েছে। এই অ্যাপস শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন আসক্তি কমাতে সহায়ক বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।
সদরের বংকিরা হাইস্কুলের সভাপতি সাকিব আল হাসান জানান, দেশে শিশু ও শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন আসক্তি চরম আকার ধারণ করেছে। মাদকের মতো এর ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্রই। তরুণ উদ্যোক্তা শাহিনের তৈরি অ্যাপসের ব্যবহার ও বিস্তার ঘটানো গেলে শিশু শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন অপব্যবহারের প্রবণতা কমবে।
সুমি বেগম জানান, তার সন্তানেরা সেই ছোটবেলা থেকেই মোবাইলে আসক্ত। মোবাইলে রিল ভিডিও ও গেমস ছাড়া তার খাবার পর্যন্ত গ্রহণ করতেন না। বড় হয়ে তারা পড়ালেখা বন্ধ করে শুধু মোবাইলে নিয়েই পড়ে থাকে। এখন জানতে পেরেছি ডেউলি সফট টেক বা মোবাইল ফোন কন্ট্রোল নামে একটি ভালো অ্যাপস তৈরি হয়েছে। এমন অ্যাপস তৈরি হলে তো প্রতিটি পিতা-মাতাই খুশি হবেন।
আইটি উদ্যোক্তা শাহিন জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিজের তৈরি অ্যাপসের স্বীকৃতি চেয়ে গুগলের কাছে তিনি আবেদন করেন। ভেরিফিকেশন শেষে গত জুলাই মাসে শাহিনুর রহমানের অ্যাপসটি প্লে স্টোরে অন্তর্ভুক্ত করে গুগল।
ঝিনাইদহের শিশু বিশেষজ্ঞ আলী হাসান ফরিদ জামিল বলেন, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ ঘটাতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই। শাহিনের তৈরি অ্যাপস, ব্যবহারের ফলে অভিভাবকরা তাদের ফোনের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে। শুনেছি এই অ্যাপস ব্যবহারের ফলে মোবাইল ফোনে শিশুরা কি করছে, কি দেখছে, সব কিছুই তদারকি করা যাবে।
ঝিনাইদহ অফিস