শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু জ্ঞানার্জন নয়; অর্জিত জ্ঞানকে প্রয়োজনের আলোকে কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানোও। আমাদের দেশে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বের হচ্ছেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা এসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশই তাদের অর্জিত শিক্ষাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছেন না। কারণ তাদের অর্জিত শিক্ষার সাথে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের মিল খুব কমই থাকছে। অন্য দিকে দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে যেসব শূন্য পদ রয়েছে সেগুলোতে নিয়োগ না দেয়ায় দিন দিন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা শুধু বাড়ছেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়েছে সাড়ে ২৪ শতাংশ। প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক লাখ ছাত্র-ছাত্রী পাস করে বের হচ্ছেন। কিন্তু সে তুলনায় তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। যদিও এই মুহূর্তে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাড়ে চার লক্ষাধিক পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদ পূরণে তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। আর বতর্মানে শ্রমবাজারে ২৬-২৮ লাখ কর্মক্ষম বেকার রয়েছেন। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় আট লাখ, যা ২০১৭ সালের জরিপের তুলনায় দ্বিগুণ। সেই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় চার লাখ। বিবিএসের সর্বশেষ হিসাবে, বেকারের সংখ্যা ২০২৩ সালে ২৫ লাখ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৭ লাখে পৌঁছেছে। আমরা খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করেছি, শেখ হাসিনার গত শাসনামলে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অর্থ লুট করে বিদেশে বিনিয়োগ করেছেন। অন্য দিকে দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে তরুণ-যুবকরা হতাশায় ভুগছেন। সন্দেহ নেই, দেশে সরকারি কর্মসংস্থানের সংখ্যা সীমিত। কিন্তু বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। উচ্চশিক্ষা শেষ করে কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস করতে চান না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দেশের শিক্ষিত তরুণ-যুবকরা বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল- দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। কর্মের সুযোগ অবারিত হবে। কিন্তু অন্তর্র্বতী সরকার তরুণ-যুবকদের কর্মসংস্থানের দিকে খুব মনোযোগ দিতে পারছে না। আমরা দেখলাম, অন্তর্র্বতী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে নানা বিষয়ে কমিশন গঠন করল। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে কোনো কমিশন গঠন করেনি। দেশের শিক্ষা আদৌ বিশ্বমানের কি না, কর্মসংস্থানমুখী কি না, না হলে তা ঢেলে সাজিয়ে কর্মসংস্থানমুখী বিশ্বমানের করা উচিত। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা হলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য রয়েই গেছে। এখানে ধনী ও দরিদ্রের শিক্ষা গ্রহণের বৈষম্য বেশ প্রকট। এই বৈষম্য ঘুচানোর দায়িত্ব সরকারের; কিন্তু কোনো সরকারই তা করেনি। আমরা চাই দেশের উচ্চশিক্ষিতরা এমন শিক্ষায় শিক্ষিত হবেন যাতে কর্মক্ষেত্রের জন্য তারা যোগ্য হয়ে বের হন। শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের সাযুজ্য না হলে সে শিক্ষা জীবনে সুখের পরিবর্তে দুঃখ বয়ে আনে। তাই কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়ার সময় এখনই। একই সাথে দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করাও সরকারের কর্তব্য। এ লক্ষ্যে সরকারকে ব্যাপক বিস্তৃত কর্মসূচি প্রণয়ন করে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রধান সম্পাদক