সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হত্যা, নির্যাতন, মব ভায়োলেন্সসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনায় নৃশংসতার মাত্রা বেড়েছে। বিশেষ করে খুনের ধরনে ভয়াবহতা ও হিংস্রতা মাত্রা ছাড়াচ্ছে। মব ভায়োলেন্স (উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিশৃঙ্খলা) করে মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে মানুষকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। আবার মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পায়ের রগ কেটেও নৃশংসতার ছাপ রাখা হচ্ছে। প্রকাশ্যে রাস্তার ওপর পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যার পর অপরাধীদের উল্লাস করতেও দেখা গেছে। একের পর এক নৃশংস হত্যা ও হামলার ঘটনায় উদ্বিগ্ন সচেতন মহল। সমাজ চিন্তক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, বিচারহীনতার কারণেই কথায় কথায় মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। অপরাধ করেও পার পেয়ে যাবে- এই মানসিকতায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে অপরাধীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজনৈতিক বিরোধ, এলাকার আধিপত্য বিস্তার, মাদকব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব, দখল, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক বিরোধ, পারিবারিক কলহ এবং সম্পত্তি নিয়ে বিরোধসহ নানা কারণে দেশে অপরাধের ধরনে নৃশংসতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে না পারায় এসব অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বুধবার মিটফোর্ড (স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ) হাসপাতালের সামনে ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)। হত্যার আগে ডেকে নিয়ে তাকে পিটিয়ে এবং ইট-পাথরের টুকরা দিয়ে আঘাত করে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করা হয়। তার শরীরের ওপর উঠে উল্লাস প্রকাশ করে হামলাকারীরা। এ সময় কেউ-ই তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। সবাই ছিল নীরব দর্শক। ঘটনার দুদিন পর এর ভিডিও প্রকাশ হওয়ায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
গত শুক্রবার খুলনার দৌলতপুরে নিজ বাসার সামনে যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লাকে তার বাড়ির সামনে গুলি করে এবং দুই পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তিনি আগে কুয়েট ক্যাম্পাসে রামদা হাতে সংঘর্ষে জড়ানোয় আলোচনায় আসেন এবং পরে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। পুলিশ বলেছে, মাহবুবুর রহমানের মৃত্যু নিশ্চিত করতেই গুলির পর তার দুই পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। একই দিন চাঁদপুরের একটি মসজিদে জুমার নামাজ শেষে মসজিদের ভেতরেই কুপিয়ে জখম করা হয় ইমাম মাওলানা নূর রহমান মাদানীকে। জুমার নামাজের খুতবার সময় ইমামের দেওয়া বক্তব্যে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা চালায় ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন। গত ৩ জুলাই সকালে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার আকবপুর ইউনিয়নের কড়ইবাড়ি গ্রামে দুই নারীসহ তিনজনকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শুধু এই ঘটনাগুলো নয়, গত কয়েক মাস ধরে দেশে গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনা বেড়ে গেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের আগস্ট থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ১০ মাসে দেশের আট বিভাগে ১৭৪ জনকে বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, কোথাও চোর, ছিনতাইকারী-চাঁদাবাজ এবং কোথাও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সহযোগী ও দোসর অপবাদ দিয়ে এসব মানুষকে হত্যা করা হয়।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) গত ৬ মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- গত ছয় মাসে কমপক্ষে ৫২৯টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় অন্তত ৭৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৪ হাজার ১২৪ জন। এই সময়ে গণপিটুনির কমপক্ষে ১৪১টি ঘটনায় নিহত হন অন্তত ৬৭ এবং আহত হন অন্তত ১১৯ জন। এ ছাড়া গত ছয় মাসে ১১২টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হন ৫৯ জন এবং আহত হন কমপক্ষে ৭২০ জন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহা. এনামুল হক বলেন, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সুপ্রবৃত্তি এবং কুপ্রবৃত্তি বর্তমান থাকে। মানুষের মধ্যে সুপ্রবৃত্তি বেশির ভাগ সময় কাজ করে; কিন্তু কোনো মন যখন কোনো সুযোগসন্ধানী হয়ে ওঠে, তখন কুপ্রবৃত্তি মাথাছাড়া দিয়ে ওঠে। এ কারণে সমাজে নৃশংস অপরাধের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া নানা কারণে অ্যাংজাইটি (দুশ্চিন্তা) থেকে হতাশা তৈরি হয়। এর ফলে সন্ত্রাস, মারামারি, হত্যার মতো ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র যেভাবে চলার কথা, সেভাবে এই দেশ চলছে না। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কেউ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। পুলিশ এখনও আত্মবিশ^াস ফিরে পায়নি। তারা বদনাম এড়াতে গা বাঁচিয়ে চলে। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অতি উৎসাহী হয়ে অনেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
এসব অপরাধ প্রতিরোধের বিষয়ে অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, পরিবারকে তার সন্তানের নৈতিকতাবোধ শিক্ষা দেওয়ার জায়গাটা পাকাপোক্ত করতে হবে। শিক্ষককে, সমাজের সর্বশ্রেণির মানুষকেই নৈতিকতাবোধ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু আমি নিজেও হতাশ যে, সমাজের কোনো জায়গায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ ও প্রেক্ষাপট দায়ী। গত বছরের ৫ আগস্টের পরে সংঘটিত সংঘাত-সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ও প্রতিরোধে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বারবার নিরাপত্তা সংকট কিংবা আক্রমণের মধ্যে পড়তে হয়েছে। এই অবস্থা কোনো একটি সমাজে চলতে থাকলে, সেখানে আইনের শাসনের পরিবর্তে রাজনৈতিক শক্তির পরিচয়ে আধিপত্য বিস্তারকেন্দ্রিক অপরাধ তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, আরেকটি বিষয় হলো কোনো একটা অপরাধ সংগঠিত হলে এর সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করা হয়। এটা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের সংশয় সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন নানাকেন্দ্রিক অস্থিরতাসহ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই ক্রান্তিকালে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচার কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যায়। যেমন- শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে এলে জ্বর, সর্দি-কাশিসহ নানা রোগ-বালাই বাসা বাঁধে। এর মূল কারণ দেশের রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। রাষ্ট্রের অবস্থাও একই রকম। রাষ্ট্রের রেজিস্ট্যান্সের ক্ষমতা হচ্ছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর কাজ এটা। তারা কীভাবে কাজ করছে, এর ওপর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নির্ভর করে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুর্বল হয়ে গেছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, ৫ আগস্টের পর মব সন্ত্রাসের কবলে দেশে এক ধরনের নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন বিচারহীনতার কবলে থাকার ফলে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের প্রভাবে গণতান্ত্রিক অবস্থা ভঙ্গুর হয়েছে। বর্তমান সরকারের তফর থেকে সংবাদ মাধ্যমে কিংবা পত্রপত্রিকায় কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও সরকারকে দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। উল্টো ‘জনরোষ’ উল্লেখ করে পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মব সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। উপরন্তু যদি কোনো অপরাধ সংগঠিত হয়, পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। আপনারা দেখেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত ঘটনাসমূহে পুলিশ প্রকৃত অপরাধীদের অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতা নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে আসাটা খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পুলিশের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সব সচেতন নাগরিকের উচিত এ বিষয়ে ভূমিকা রাখা।
সমীকরণ প্রতিবেদন