ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে ওবাইদুল ইসলাম (৩৬) নামে এক বাংলাদেশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ’র গুলিতে নিহত হয়েছেন। ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাগদা থানার মধুপুর এলাকায় তাকে হত্যা করা হয়। নিহত ওবাইদুল ইসলাম মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের হানেফ আলীর ছেলে। গ্রামবাসী জানান, গত শনিবার রাতে ওবাইদুলসহ ৭-৮ জনের একটি দল ভারতে প্রবেশ করে। এসময় ভারতের মধুপুর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের ঘিরে ফেলে। বিএসএফ’র হাত থেকে অন্যরা পালিয়ে এলেও ওবাইদুল ধরা পড়ে।
স্থানীয় গ্রাম পুলিশ ওমর আলী জানান, খবর পেয়ে তিনি ওবাইদুলের বাড়িতে যান। বাড়িতে সবাই কান্নাকাটি করছেন। তিনি আরও জানান, রাত একটার দিকে ওপারে গুলির শব্দ শুনেছেন গ্রামবাসী। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ওবাইদুলকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যাদবপুর ইউনিয়নের মেম্বার বাবুল হোসেন জানান, তিনিও সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির খবর শুনেছেন। এ ঘটনার পর থেকেই শোনা যাচ্ছে, গোপালপুর গ্রামের ওবাইদুল নিখোঁজ রয়েছেন। ওপারে পড়ে থাকা লাশটি ওবাইদুলের হতে পারে বলে ধারণা।
বিজিবির যাদবপুর বিওপির কমান্ডার হাবিলদার মফিজুল ইসলাম জানান, লোকমুখে এমন খবর পেয়ে তিনি সীমান্তে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তবে পরিবার তাদের দপ্তরে কোনো অভিযোগ করেনি। স্থানীয় গ্রাম পুলিশ সূত্রে বলা হচ্ছে, লাশ উদ্ধারের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে বিজিবির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যাদবপুর বিওপি জানিয়েছে, তারা এমন কোনো চিঠি পায়নি। গতকার রোববার বিকেলে বিএসএফ’র সঙ্গে বৈঠক হলেও সেটি ছিল নিয়মিত বৈঠক, লাশ ফেরতের বিষয়ে নয়।
মহেশপুর-৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. রফিকুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, সকাল পৌনে ৯টার দিকে বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ফোন করে একজনের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মরদেহটি বাংলাদেশি কি না, তা তারা নিশ্চিত করেনি। ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাগদা থানায় মরদেহ রাখা আছে। মরদেহটি বাংলাদেশির কি না, তা নিয়ে কারো কোনো বক্তব্য থাকলে বিএসএফ ও বাগদা থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এদিকে, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তে গত ৮ এপ্রিল ওয়াসিম নামে এক বাংলাদেশি যুবককে হত্যা করে ইছামতি নদীতে ফেলে দেয় বিএসএফ। এ ঘটনার ১৯ দিন পার হলেও তার লাশ ফেরত আসেনি। নিহত ওয়াসিম বাঘাডাঙ্গা গ্রামের রমজান আলীর ছেলে।
ওয়াসিমের ভাই মেহেদী হাসান দাবি করেন, গত ৮ এপ্রিল ওয়াসিমসহ কয়েকজন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান। ফেরার সময় বিএসএফ তাদের ধাওয়া করে। মহেশপুরের সলেমানপুর গ্রামের আব্দুস সোবহান, কাঞ্চনপুর গ্রামের রাজু, শাহাবুদ্দিন, মানিক ও বাঘাডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল ওয়াহেদ ফিরে এলেও ওয়াসিম বিএসএফ’র হাতে ধরা পড়েন। পরে তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় এবং লাশ ইছামতি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। বিজিবি লাশ ফেরত চাইলেও ভিসা ও আইনি জটিলতার কারণে এখনো লাশ ফেরত আসেনি। ভারতীয় পুলিশ বিজিবিকে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে লাশ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। তবে ভারতে গিয়ে লাশ শনাক্ত করার সক্ষমতা ওয়াসিমের পরিবারের নেই।
প্রসঙ্গত, সীমান্তে গত ১০ বছরে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র হাতে কমপক্ষে ৩০৫ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২৮২ জন বলে জানায় মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। এই সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটে ২০২০ সালে। ওই বছর ৫১ বাংলাদেশি নিহত হন এবং ২৫ জন আহত হন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০১৫ সালে ৪৩ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হন। ২০১৯ সালে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৪২ বাংলাদেশি নিহত হন এবং আহত হন ২৫ জন।
এছাড়া ২০২৪ সালে ২৬ বাংলাদেশি নিহত ও ২৫ জন আহত হন। ২০২৩ সালে নিহত হন ৩০ জন ও আহত ৩১ জন, ২০২২ সালে নিহত ২৩ জন ও আহত ৩১ জন, ২০২১ সালে নিহত ১৭ জন ও আহত ১৪ জন, ২০১৮ সালে নিহত হন ১৫ জন ও আহত ১২ জন, ২০১৭ সালে নিহত হন ৩০ জন ও আহত ৩৭ জন এবং ২০১৬ সালে ২৮ জন নিহত ও ২৮ জন আহত হন
সমীকরণ প্রতিবেদন