শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

বাসা ভাড়া নিয়ে বিপাকে নিম্ন আয়ের মানুষেরা

  • আপলোড তারিখঃ ১২-০৪-২০২০ ইং
বাসা ভাড়া নিয়ে বিপাকে নিম্ন আয়ের মানুষেরা
নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী মহামারির রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশেও রীতিমতো এ ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে। এ রোগটি বাংলাদেশে শনাক্ত হওয়ার পরপরই সরকার সব সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ দোকানপাট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে বেসরকারি চাকরিজীবীসহ নানা পেশার শ্রমজীবী দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো পড়েছেন বিপাকে। কিছু কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ইতিমধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসের হাফ বেতন দেবে বলে জানিয়েছে। আবার শ্রমজীবী মানুষগুলোর কোনো কাজ নেই, উপার্জনও নেই বলে আতঙ্কে রয়েছেন তাঁরাও। টাকা থাকুক আর না থাকুক মাস শেষে বাসা ভাড়া দিতেই হবে। রহমান আলীর (ছদ্ম নাম) চুয়াডাঙ্গা শহরের কোর্ট রোডে একটি সেলুনের দোকান আছে। সরকারি নির্দেশনায় গত ১৭ দিন বন্ধ দোকানটি। ভাড়া নিয়ে তিনি চুল কাটার কাজ করেন এই দোকানে। এখান থেকে আয় হওয়া অর্থে তাঁর পরিবারও চলে। এখন তাঁর মাথায় হাত, প্রথমত বাসা ভাড়া, তারপর দোকান ভাড়া আবার পরিবারের পুরো খরচ। সবমিলিয়ে তিনি এখন ধারদেনা করে চেয়েচিন্তে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন। এ মাসে হয়ত বাসা ভাড়া দিতে পারবেন না। আর বাসা ভাড়া না দিলে মালিক তাঁকে বাসা ছেড়ে দিতে বলবেন কি না, তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন তিনি। কেবল রহমান আলীই নন, তাঁর মতো অসংখ্য নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষ এখন একই সমস্যায় ভুগছেন। কীভাবে বাসা ভাড়া দেবেন, বুঝতে পারছেন না। কাজকর্ম বন্ধ হওয়ার পর চোখে অন্ধকার দেখছেন। সন্তানদের মুখে কীভাবে খাবার তুলে দেবেন, সামনের দিনগুলো কীভাবে চলবেন, তা চিন্তা করে এখন দিশেহারা। এ অবস্থায় তাঁদের বাড়ির মালিকেরা যদি বাসা ভাড়া মওকুফ করেন, তাহলে হয়তো কোনোভাবে বাঁচতে পারবেন। অন্যথায় পথে নামা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। শাহিন আলী (ছদ্ম নাম) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিল্ড সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করেন। বেতন দিয়ে বাসা থেকে শুরু করে পরিবারের সব খরচই হয়ে যায় তাঁর। কিন্তু এ মাসে প্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধ থাকায় হাফ বেতন দেওয়া হবে তাকেসহ অনান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। এমনটিই ঘোষণা দিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি। এমন অবস্থায় চরম বিপদের মধ্যে আছেন তিনি। বাসা ভাড়া মওকুফ করা হলে, তিনি কিছুটা স্বস্তি পাবেন। আরেকজন রাফিদ বিশ্বাস (ছদ্মনাম) চুয়াডাঙ্গার একটি স্টুডিওতে ছবি তোলার কাজ করেন। তিনি যা রোজগার করেন তা দিয়ে বাসা ভাড়া, পুরো মাসের বাজার, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ কোনোরকম চলে যায়। কিন্তু সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে প্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া সব দোকান বন্ধ ঘোষণা করায় তিনি পড়েছেন চরম বিপদে। স্টুডিও বন্ধ থাকায় তাঁর কোনো রোজগার নেই প্রতিদিনের বাজারও করতে হচ্ছে তাঁকে। রাফিদ বিশ্বাস বলেন, বাসায় প্রায় ১৭ দিন ধরে বসে আছি। কোনো রোজগার নেই। সামনের দিনগুলোতে খাবো কী? আর বাসা ভাড়াই দেবো কী? সেটা এখন সবথেকে বড় চিন্তা। চুয়াডাঙ্গা রেল পাড়ার একটি বাড়িতে ভাড়ায় থাকেন দর্জির দোকানি আবুল বিশ্বাস। রেল বাজারে তাঁর একটি দর্জির দোকান আছে। তিনি বলেন, প্রায় ১৭ দিন ধরে বাসায় বসে আছি। দোকান বন্ধ কাজ নেই। বাসা ভাড়া তো আছেই, আবার দোকানের ভাড়াও দিতে হবে। অপরদিকে, কিছু কিছু বাড়িওয়ালা আছেন, যাঁরা শুধুমাত্র বাড়িভাড়া বা দোকান ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল। এরই মধ্যে দেশের কিছু কিছু এলাকার বাড়িওয়ালা এক মাসের জন্য বাড়িভাড়া মওকুফ করে দিয়েছেন। আবার কিছু কিছু বাড়িওয়ালা বলছেন, হোল্ডিং ট্যাক্স ও বিদুৎ বিল মওকুফ করলে তারা বাড়িভাড়া মওকুফ করতে পারবেন। এতে তাঁদের ওপর থেকেও কিছুটা চাপ কমবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ প্রসঙ্গে একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাড়িওয়ালারা চাইলে নিম্ন আয়ের মানুষের দুই মাসের ভাড়ার ৫০ থেকে শতভাগ মওকুফ করে দিতে পারেন। কিন্তু অনেক বাড়িওয়ালা আছেন, যাদের বাড়ি ভাড়ার ওপর নির্ভর করে সংসার চলে। অনেকে ঘরবাড়ি বানানোর সময় ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। ভাড়ার টাকা দিয়ে তারা ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করেন। এ ক্ষেত্রে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কাছে বাড়ি মালিকদের তথ্য থাকে। যেসব বাড়ি মালিকের ব্যাংক ঋণ আছে তাদের হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাড়ি মালিকরা সহজেই ভাড়াটিয়াদের এক-দু'মাসের ভাড়া মওকুফ করে দিতে পারবেন। চুয়াডাঙ্গা শহরের কোর্টপাড়ার একটি বাড়ির মালিক জুয়েল রানা বলেন, দেশের এই পরিস্থিতিতে সবাইকে তো চলতে হবে। সরকার যদি হোল্ডিং ট্যাক্স ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করে দেয়, তাহলে এক মাসের বাড়িভাড়া মওকুফ করা যায়। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে কেবল নিম্ন আয়ের মানুষই নয়; নিম্ন-মধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের মানুষও সংকটে পড়তে পারেন। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষ সাবলীলভাবেই ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়াতে পারবেন। প্রয়োজনে কারও কাছে কিছু চাইতে পারবেন। কিন্তু নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ লাইনে দাঁড়াতে সংকোচ বোধ করেন। ভেতরে ভেতরে এ শ্রেণির মানুষও সংকটে পড়তে যাচ্ছেন। এখন সময় এসেছে, আমাদের একে অন্যের পাশে দাঁড়াবার।


কমেন্ট বক্স