ঝিনাইদহের ৮১৫ কিলোমিটার খাল ৭৮৮ জনের দখলে!
- আপলোড তারিখঃ
২৩-০২-২০২০
ইং
ঝিনাইদহ অফিস:
ঝিনাইদহে জিকে সেচ প্রকল্পের আওতাধীন ৮১৫ কিলোমিটার খালটি ৭৮৮ জন দখল করে নিয়েছেন। দখলকৃত খালের মধ্যেই দোপানপাট, ঘরবাড়ি এমনকি পাড় কেটে চাষাবাদও করা হচ্ছে। বড় বড় ভবনও গড়ে তোলা হয়েছে এই খালের জায়গায়। অনেক স্থানে বোঝার উপায় নেই, এখানে একটি খাল ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা দখলদার সনাক্ত করতে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করবে। আর দখলদারদের কথা, এই খাল আর কখনও যৌবন ফিরে পাবে না, খালের বুকে পানি থৈ থৈ করবে না। তাই মরা খালের জায়গা তাঁরা ব্যবহার করছেন।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ঝিনাইদহসহ জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৪ জেলার ১৫টি উপজেলায় কৃষকের জমিতে চাষাবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এই সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার উপজেলাগুলোতে সেচ খাল খনন করা হয়। যার প্রথম কাজ শুরু হয় ১৯৫৫-৫৬ অর্থবছরে। খাল খননের মাধ্যমে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫ শ হেক্টর জমি সেচ ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হয়। এ সময় ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু, শৈলকুপা ও সদর উপজেলাতে খাল খনন করা হয়। যার পরিমাণ ছিল ৮১৫ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি ছিল গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প। কুষ্টিয়ার গঙ্গা থেকে পানি তুলে যশোরের কপোতাক্ষ পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা ছিল। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত পাম্প হাউজ থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। ১৯৬৫ সালে প্রথম পানি প্রবাহ শুরু হয় ঝিনাইদহে। প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ঝিনাইদহের ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ কার্যক্রম চলছে।
হরিণাকুণ্ডু ও শৈলকুপার একাধিক কৃষক জানান, ৯০ দশকের পর এই খালের গুরুত্ব কমতে থাকে। অনেক স্থানে তখন ঠিক মতো পানি প্রবাহ ছিল না। আবার খালটি দীর্ঘ সময় সংস্কার না করায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। আর এই সুযোগটি নেন দখলদারেরা। তাঁরা পানি প্রবাহ বন্ধ দেখে খালের জমি দখল করতে শুরু করেন। এভাবে একে একে খালের অনেক জায়গা দখল হয়ে গেছে। ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে খোঁজ নিয়ে দখল হয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ মেলানো সম্ভব হয়নি। শুধুমাত্র হরিণাকুণ্ডু আর শৈলকুপা উপজেলায় ৭৮৮ জন দখলদারের সন্ধান মিলেছে। যার মধ্যে শৈলকুপা উপজেলায় রয়েছেন ৬০৬ জন, আর হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রয়েছেন ১৮২ জন। এরা দখল করা জমিতে বাড়ি-ঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। অনেকে খাল কেটে জমি সমতল বানিয়ে সেখানে চাষাবাদ করছেন।
হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ওই গ্রামের সিরাজুল ইসলাম খালের ওপর বাড়ি নির্মাণ করেছেন। যে স্থানটি দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই, এখানে এক সময় খাল ছিল। একই উপজেলার সাতব্রিজ নামক স্থানে খালের ওপর দোকান করেছেন রবিউল ইসলাম। তিনি জানান, দোকানটি বেশ কয়েক দফা বেচাকেনা হয়েছে। বরিশখালী গ্রামের আনোয়ার হোসেন জানান, খাল এখন আর কোনো কাজে আসে না। যে কারণে তাঁর মতো অনেকে দখল করেছেন। শৈলকুপা উপজেলার খাল দখল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই উপজেলার ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়ন এলাকায় ২৬৫ জন দখলদার রয়েছেন। এছাড়া সারুটিয়া ইউনিয়ন এলাকায় ১৭৮ জন, হাকিমপুরে ৯৬ জন ও পৌরসভা এলাকাতে ৬৭ জন দখলদার রয়েছেন। কাতলাগাড়ি এলাকার মতিয়ার রহমান জানান, এক সময় খাল তাঁদের অনেক উপকারে এসেছে। এই খালে পানি ছাড়া হতো যা দিয়ে তাঁরা চাষাবাদ করতেন। কিন্তু গত দুই দশকের বেশি সময় ঠিক মতো পানি পাওয়া যায় না। যে কারণে খালগুলো দখল হয়েছে। তবে দখলদারেরা অনেকেই খাল পুনঃরায় খনন করে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখতে পারলে তাঁরা উপকৃত হবেন বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও খুরশিদ শরিফ জানান, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পটি পূর্বের মতো না থাকলেও এখনও চালু রয়েছে। তাঁরা ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দিচ্ছেন। বছরে একর প্রতি মাত্র ৫ শ টাকায় পানি পাচ্ছেন কৃষকেরা। তবে যেখানে প্রকল্পটি চালু রেখেছেন, তা খুবই কষ্ট করে রাখা হয়েছে। কৃষকেরা ঠিকমতো সেচ বিল দেন না। আবার খালগুলো ভালো না থাকায় পানির অপচয় হয়ে থাকে। যে কারণে কৃষকের জমিতে পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে অনেক বেগ পেতে হয়। তিনি আরও বলেন, লাইনিং পদ্ধতিতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করলে কৃষকেরা ঠিক মতো পানি পাবে। সেচ প্রকল্প বাঁচিয়ে রাখতে হলে খালে দখলদার উচ্ছেদ জরুরি বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, তাঁরা দ্রুত অবৈধ উচ্ছেদের জন্য কাজ করছেন। ইতিমধ্যে বিষয়টি উচ্চপর্যায়কে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছেন, দ্রুতই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে।
কমেন্ট বক্স