রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলেই পথচারীদের বমি আসে

  • আপলোড তারিখঃ ০৯-০২-২০২০ ইং
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গেলেই পথচারীদের বমি আসে
চুয়াডাঙ্গায় ড্রেনের সঙ্গে টয়লেটের লাইনই পরিচ্ছন্ন জেলা ঘোষণার অন্তরায় মেহেরাব্বিন সানভী: শহর হিসেবে চুয়াডাঙ্গা পৌর শহর খুব একটা বড় না। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির একটি পৌরসভা। এ বছর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা উদ্যোগ নিয়েছে এ জেলাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জেলা হিসেবে ঘোষণা করার। ইতিমধ্যে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা ও একটি মহাপরিকল্পনা করেছেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার। মহতী এ উদ্যোগ নিসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। সাধুবাদ জানিয়েছেন, চুয়াডাঙ্গার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ অধিকাংশ নাগরিক। ছোট্ট এ শহরটির অপরিচ্ছন্ন পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য প্রচেষ্টার কমতি নেই চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন ও চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার। চুয়াডাঙ্গা জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক সায়মা ইউনুস, জিয়াউদ্দীন আহমেদ ও গোপাল চন্দ্র দাস, সাবেক পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম (বার), চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান জিপুসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, এনজিও কর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিারাও ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নেমেছেন একটি পরিচ্ছন্ন জেলা হিসেবে চুয়াডাঙ্গকে গড়ে তোলার। সাবেক জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ঘোষণা করেছিলেন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের, সফলতাও ছিল দৃশ্যমান। সারা দেশের নজর কেড়েছে নগর পিতা ওবাইদুর রহমান চৌধুরি জিপুর নেতৃত্বে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল পরিষ্কারের কাজটি। কর্মপরিকল্পনা ও আয়োজনের কমতি নেই প্রশাসনের। কিন্তু পৌর নাগরিকদের মধ্যে যে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ থাকা দরকার তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যত্রতত্র ময়লা ফেলা তো আছেই তবে এই মূহুর্তে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে বেশকছিু বাসা-বাড়ির টয়লেটের মলের পাইপ সরাসরি ড্রেনের সাথে যুক্ত থাকা। শুনতে খারাপ লাগলেও এ ব্যপারটি এখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চুয়াডাঙ্গা ও চুয়াডাঙ্গার পরিবেশের উন্নতির ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়। সুশীল সমাজ ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশের জন্য বড় ধরের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করে হলেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে মাথাভাঙ্গা নদী বাচাঁও আন্দোলনের আহ্বায়ক সাবেক অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সি বলেন, ‘সময় এসেছে আমাদের সচেতেন হওয়ার। একুশ শতকে এসে এমন একটি বিষয় সত্যিই দুঃখজনক এবং লজ্জার ব্যাপার। মানুষের মনের পরিচ্ছন্নতা এবং মানসিকতার পরিবর্তনের দরকার। চুয়াডাঙ্গা শহরের ড্রেনগুলো মাথাভাঙ্গা নদীতে যেয়ে পড়ছে। ক্ষতির সীমা নেই। এখনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে আফসোসের সীমাও থাকবে না একদিন। জনপ্রতিনিধিদের শক্ত হাতে এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। প্রশাসনের নিতে হবে উদ্যোগী ভূমিকা। প্রয়োজনে পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ তিনি আরও জানান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চুয়াডাঙ্গা প্রতিষ্ঠার জন্য শুরু থেকেই আবার শুরু করতে হবে। গোড়ায় গন্ডগোল রাখা যাবে না। সচেতনতা বাড়ানোর জন্য দুই-একজনকে শাস্তি দিলেও দিতে হবে। চুয়াডাঙ্গা শহরের ১নং পানির ট্যাংক এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন দৈনিক সময়ের সমীকরণকে বলেন, ‘শহরের কয়েকটি ড্রেন একেবারে রাস্তার উপর দিয়ে। আমাদের বাড়ির পাশের গলির রাস্তাটির সাথেও ড্রেন আছে। এতো পরিমাণে মলের দুর্গন্ধ যে রাতে বাসার মধ্যে ঘুমানো যায় না। রাস্তা দিয়ে হাটতে গেলেই বমি আসে।’ চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার পেছনের শেকরাতলা পাড়ার বাসিন্দা নিশাত। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র তিনি। এক কথায় ক্ষুদ্ধ হয়েই জানালেন, শহরের কয়েকটি ভেতরের রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। থেকে থেকে এতো দুর্গন্ধ আসে যে, মনে হয় ঐ স্থানের বাসা-বাড়িতে যেয়ে একবার বলেই আসি।’ বাংলাদেশে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা’র খুলনা বিভাগের সমন্বয়কারী অ্যাড. মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘বিষয়টি উদ্বেগজনক। প্রথমে প্রয়োজন সচেতনতার। এ বিষয়ে প্রথম দায় পৌরসভার। পৌরসভাকেই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। মিউনিসিপ্যাল আইন-২০০৯ অনুযায়ী এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এটির সমাধান না করলে পরিবেশ দূষণমুক্ত করা সম্ভব নয়।’ চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান বলেন- কোনভাবেই মলের লাইন ড্রেনে যুক্ত করা যাবে না। এতে পরিবেশের বড় ধরনের ক্ষতিসহ পানিবাহিত রোগ বাড়তে পারে। টিউবয়েলের আসে পাশে ড্রেন থাকলেও সমস্যা হতে পারে। জলাশয় বা নদীতে সেই পানি পড়লে জলাশয় নদীসহ এলাকাগুলোও দূষিত হবে। বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। চুয়াডাঙ্গা পৌর মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরি জিপু বলেন, ‘সমস্যাটি গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। চুয়াডাঙ্গা জেলাকে যেকোনো মূল্যে পরিচ্ছন্ন চুয়াডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত করা হবে। বিশুদ্ধ পরিবেশ নাগরিক জীবনকে করে ছন্দময়। আর এর জন্য শহরবাসী তাকিয়ে থাকেন পৌর কর্তৃপক্ষের দিকে। পৌর মেয়র হয়েছি, পৌরবাসীর সেবা করার জন্য। শহরবাসীকে পরিচ্ছন্নতার বৈজ্ঞানিক সমাধানের জন্য কাজ করছি। ইতিমধ্যে একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যশোরের ঝুমঝুমে অবস্থিত পৌরসভার ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মতোই চুয়াডাঙ্গা পৌরসভাতেও অতিদ্রুত একটি ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে। ইতিমধ্যেই আমি পদক্ষেপ নিয়েছি। নয় বিঘা জমির ওপর এটি প্রতিষ্ঠিত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি মহল গুজব ছড়াচ্ছে যে এটি যে স্থানে হবে, সেখানের মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি হবে, কিন্তু তা নয়। যশোরের প্ল্যান্টটিকে আমরা উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি। কোনো ক্ষতিই হবে না।’ মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরি জিপু বলেন, এখানে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বায়োগ্যাস, জৈব সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ময়লা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। আর এ উৎপাদিত বিদ্যুৎ ময়লা প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন প্ল্যান্ট পরিচালনায় ব্যবহার হবে। পাশাপাশি এ থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস পাইপ লাইনের মাধ্যমে আশপাশ এলাকার বাসা বাড়িতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরবরাহ করা হবে। পচনশীল, দাহ্য, কাচ ও লোহা জাতীয় বর্জ্য ওই কেন্দ্রে প্রক্রিয়াজাত করা হবে। সেপটি ট্যাংকের বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব জৈব সার উৎপাদন করে বাজারজাত করা হবে। মেয়র আরও জানান, ‘ অতিদ্রুতই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চুয়াডাঙ্গার পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ কাজ করছি।’ চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘ড্রেনের সঙ্গে সরাসরি টয়লেটের পাইপ লাইন থাকা মোটেও ভালো বিষয় নয়। এটা আমি জানতাম না। এ বিষয়ে আমি পৌর মেয়রের সঙ্গে কথা বলব। অতিদ্রতই এটি সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। চুয়াডাঙ্গা জেলাকে পরিচ্ছন্ন জেলা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


কমেন্ট বক্স