শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

মুজিবনগরে জনপ্রিয় হচ্ছে মাল্টা চাষ!

  • আপলোড তারিখঃ ২৩-১১-২০১৮ ইং
মুজিবনগরে জনপ্রিয় হচ্ছে মাল্টা চাষ!
মুনশী মোকাদ্দেস/শেরখান: যেকোন উচুঁ জমিতে একবার মাল্টার চারা লাগালে এবং যতœ নিয়ে বড় করলে আর কোনদিন পিছনে ফিরে তাকাতে হয়না। মাত্র দেড় বছর বয়স থেকে গাছ মাল্টা দিতে শুরু করে। সাথে বড় ধরনের কোন রোগ-বালাইয়ের দেখাও মেলেনা এ চাষে। তাই মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলায় ঝুঁকিমুক্ত অধিক লাভজনক হওয়ায় মাল্টা চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালী গ্রামের ইসমাইল হোসেন। যিনি এক সময়ে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পরিবার পরিজন ফেলে দক্ষিণ কোরিয়া পাড়ি জমান। কিন্তু সময়ের পালাবদলে প্রবাসে খুব একটা ভালো দিন যাচ্ছিল না। পরে দেশে ফিরে এসে বেশ কয়েকটি কৃষি পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। এরমধ্যে ধরা দেয় মাল্টা চাষ। মাল্টা চাষে শুধু তার জীবন উন্নয়ন হয়নি, সে এখন জেলার অনেক মানুষের জীবন পাল্টে দিয়েছে। তার দেখাদেখি এবং তার সাথে মাল্টার চারা ক্রয় করে এবং পরামর্শ নিয়ে মাল্টা চাষে স্বাবলম্বি হয়েছে অনেক চাষি। জানা গেছে, মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালী গ্রামটি জেলা সদর থেকে ৫ কিঃ মিঃ দুরত্বে অবস্থিত এবং মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালি ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত গ্রাম। এ গ্রাম পার হয়ে শিবপুর সড়কের দিকে এগোলেই রাস্তার ধারেই দেখা যায় মাল্টার বাগান। প্রতিটি গাছে থরে থরে সাজানো হলুদ ও সবুজ রঙের মাল্টা। ১৩ কাঠা জমিতে ৪৮টি মাল্টাগাছের সবটির অবস্থা একই রকম। নতুন এ চাষটি জেলার প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে দিতে স্বপ্ন দেখছেন ওই গ্রামের প্রবাস ফেরত ইসমাইল হোসেন। পাঁচ বছর ধরেই তিনি এ বাগানটিকে পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। অপর একটি স্থানে নতুন করে ১০ বিঘা জমিতে প্রায় ৭৫০টি মাল্টা চারা রোপন করেছেন তিনি। সাড়ে তিন বছর ধরে বাগান থেকে ফল বিক্রি করে ভালো আয় করেছেন তিনি। তাঁর এই মাল্টা চাষ দেখে এলাকার চাষিরা অন্যান্য চাষের পরিবর্তে মাল্টায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। স্থানীয় পর্যায়ে এরই মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১২টি মাল্টা বাগান গড়ে উঠেছে। প্রতিটি বাগানে ইসমাইল হোসেন তার নিজের উৎপাদিত চারা সরবরাহ করছেন। জানা গেছে, দেশে বারি-১ জাতের মাল্টার চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটির স্বাদ এবং ফলন দুটিই ভালো। সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে ফল ধরে এবং এটি পরিপক্ক¦ হয়ে কমলা রং ধারণ করে সেপ্টেম্বর মাসের দিকে। তখন এটি বাজারজাত করা হয়। স্থানীয় বাজার ছাড়াও রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও বাদামতলী মার্কেটে এখানে উৎপাদিত মাল্টা বিক্রি করা হয়। মুজিবনগর তথা মেহেরপুরে মাল্টা চাষ নিয়ে ইসমাইল জানান, ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে দক্ষিণ কোরিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে সাড়ে ৫ বছরের প্রবাস জীবন আমাকে ভালো কিছু দিতে পারেনি। তাই দেশে ফিরে এসে নতুন কিছু করার ভাবনা থেকে মাল্টা চাষ শুরু করেছি। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইসমাইলের আগে মেহেরপুর জেলায় মাল্টা চাষ কেউ করেনি। অথচ অত্যন্ত লাভজনক একটি চাষ হলো মাল্টা। এই চাষে লোকসানের আশঙ্কা নেই। চাষ শুরু করার দুই বছর থেকে ফল আসা শুরু করে। চাষের প্রথম বছরেই এর মূল বিনিয়োগটা করা লাগে। এর পর থেকে মাঝেমধ্যে সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা করলেই হয়। তিনি জানান, দ্বিতীয় বছরে ১৩ কাঠার বাগান থেকে যে পরিমাণ ফলে এসেছিল তা বিক্রি করে প্রায় ২০ হাজার টাকা, পরের বছর ৭০ হাজার এবং গত বছরে বিক্রি করেছেন এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তাঁর এই বাগানটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল মাত্র ৩০ হাজার টাকা। অন্য যে ১০ বিঘার বাগানটি করেছেন সেই বাগানে এ বছর ফল এলেও সেগুলো তিনি ফেলে দিয়েছেন। যাতে গাছগুলো সঠিক মাত্রায় বেড়ে উঠতে পারে। আগামী বছর থেকে ওই ১০ বিঘা বাগানের ফল বিক্রি করবেন। মাল্টা চাষে বিঘা প্রতি কোন প্রকার ঝুঁকি ছাড়াই বছরে প্রায় ২ লাখ টাকা লাভ হওয়ার নিশ্চিয়তা দেন তিনি। ইসমাইলের মাল্টা চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ গ্রাম মোনাখালী, মুজিবনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, সদর উপজেলার রাধাকান্তপুর, যাদবপুর ও গাংনী উপজেলাসহ এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষক মাল্টা চাষে ঝুঁকেছেন। এর মধ্যে মোনাখালী গ্রামের শফি উদ্দিন, মুকুল শেখ, হাবেল উদ্দিন, খাদেমুল ইসলাম, রাব্বি ও মজনু শেখ চাষ শুরু করেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বাতাবি লেবু ও কমলা এই দুই ফলের সংকরায়নের মাধ্যমে মাল্টার উদ্ভাবন। বারি-১ জাতের মাল্টা স্বাদ এবং ফলন দুটিই ভালো। মেহেরপুরের মাটি মাল্টা চাষের জন্য উপযোগী। ইসমাইলকে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। মুজিবনগর উপজেলা কৃষি অফিসার আনিসুজ্জামান খাঁন বলেন, দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের আওতায় এই মাল্টা বাগান ইসমাইল হোসেন স্থাপন করেন। মুজিবনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিবিড় তত্ত্বাবধানে মাল্টা বাগানটি বেড়ে ওঠে। প্রতি বছর তিনি এই বাগান থেকে মাল্টা বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ টাকা উপার্জন করেন। এছাড়া তিনি কৃষি অফিসের সহায়তায় কলম তৈরি করে কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করে বারি ১-মাল্টা জাতটি সম্প্রসারণ করছেন। এছাড়া মুজিবনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মুজিবনগরের মাটি মাল্টা চাষের উপযোগী এবং অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকদেরকে মাল্ট চাষে উদ্বুদ্ধ করছে এবং যে সব কৃষক মাল্টা চাষে আগ্রহ প্রকাশ করছে ও যারা মাল্টা বাগান করেছেন তাদেরকে সবরকম সহযোগীতা করছে। ইতিমধ্যে ইসমাইল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কারের মনোনয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে।


কমেন্ট বক্স