টাকার প্রলোভন দেখিয়ে চুয়াডাঙ্গার তিন নাবালিকাকে পাচার : ঢাকার মিরপুর থেকে পাচারের তিনদিন পর
অঙ্কন মল্লিক: চুয়াডাঙ্গার জাফরপুরস্থ নতুন স্টেডিয়ামপাড়ায় তিন নাবালিকাকে টাকার প্রলোভনে ঢাকায় পাচার করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে একই এলাকার স্বামী পরিত্যক্তা তাজনিনার বিরুদ্ধে। তাজননিনার বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাকে এখনো পর্যন্ত আটক করেনি পুলিশ। সদর থানা পুলিশের রহস্যজনক আচরণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তবে পাচার হওয়া তিন নাবালিকা তিনদিন পর পুলিশের সহযোগিতায় উদ্ধার হয়েছে। এঘটনায় এখনো কোন মামলা হয়নি। আজ মামলা হতে পারে বলে পুলিশের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধার হওয়া নাবালিকারা হলো, চুয়াডাঙ্গার নতুন স্টেডিয়াম পাড়ার তোয়াজ উদ্দিনের মেয়ে তন্নি খাতুন (১৪), একই এলাকার বাবলুর মেয়ে সুমাইয়া খাতুন (১৩), কলোনী পাড়ার তাছনিনা খাতুন (১৫)।
উদ্ধার হওয়া নাবালিকারা এ প্রতিবেদককে জানায়, জাফরপুর গ্রামের স্টেডিয়ামপাড়ার স্বামী পরিত্যক্তা তাজনিনা খাতুন তাদের টাকার লোভ দেখাতো। বলতো তোমাদের মা বাবা তো অনেক গরিব। আমি তোমাদেরকে কাজ দিবো। বিদেশে গিয়ে তোমরা টাকা উপার্জন করে বাবা মাকে দিবা। যেন তোমাদের বাবা মায়ের কোন কষ্ট না হয়। অবুঝ শিশুরা খুব সহজেই বিষয়টি মেনে নেয়। তাজনিনা খাতুন তাদের আরও বলে, এ কথা তোমাদের বাবা-মায়ের কারও কাছে বলবা না।
নাবালিকারা আরো জানায়, এরপরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার দুপুরে আমাদেরকে নিয়ে তাজনিনা কলোনীপাড়ার মোড়ে আসে। এসময় তাজনিনা চয়ন নামের একটি ছেলেকে ফোন করে এবং আমাদের চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকার একটি ক্লাবে আটকে রেখে চয়ন নামের ওই ছেলের সাথে তাজনিনা তার ভাড়া রুমে চলে যায়। তারা যাওয়ার আগে বিস্কুট ও পানি খেতে দিয়োছলো আমাদের। পরের দিন মঙ্গলবার ভোরে চুয়াডাঙ্গা স্টেশন থেকে গোয়ালন্দ ট্রেনে করে আমাদের তিনজনকে ঢাকা নিয়ে যায়। এবং ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর এলাকার পানির ট্যাংকির আশেপাশে একটি ঘরে নিয়ে যায়। ওই সময় সেই ঢুকে দেখি আরো ১১ জন বিভিন্ন বয়সের মেয়ে ঘরে রয়েছে। আমরা ওই রুমে থাকতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদেরকে তাজনিন ওই রুমে রেখে বিভিন্নভাবে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। একপর্যায়ে আমরা তাজনিনের সব কথা শুনতে রাজি হলে নির্যাতনের মাত্রা কম হতো।

এদিকে, গত মঙ্গলবার রাতে নাবালিকা সুমাইয়া বাসা থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া মোবাইল দিয়ে গোপনে তার খালার কাছে কল করে তাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি জানায়। সুমাইয়ার খালাসহ ওই নাবালিকাদের পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে সাথে সাথে বিষয়টি অবগত করে। পরে পুলিশ কৌশলে পাচারকারী তাজনিনের নানী মালেকার সাথে নাবালিকা সুমাইয়ার খালাকে ঢাকায় পাঠায়। তারা ঢাকার মিরপুরে পৌছালে আকবর নামের এক দালাল তাদেরকে মিরপুর-১ নম্বর এলাকার পানির ট্যাংকির আশেপাশে অবস্থিত ওই রুমে নিয়ে যায়। এবং আকবর দালাল সুমাইয়ার খাল কে সাদা কাগজে সই করিয়ে তিন নাবালিকাকে তার কাছে ফেরত দেয়। এসময় সুমাইয়ার খালা কৌশলে পাচারকারি তাজনিনকে চুয়াডাঙ্গা নিয়ে আসতে চাইলে তাজনিনের নানী বলে তোকে চুয়াডাঙ্গা যেতে হবে না। কিন্তু তাজনিন তার নানী মালেকার কথা না শুনে তিন নাবালিকার সাথে চুয়াডাঙ্গা ফেরত আসে। পাচারকারি তাজনিন ফেরত এসে বুঝতে পারে এটা পুরো পুলিশের সাজানো নাটক। এরপর থেকে সে গা’ঢাকা দিয়েছে।
উদ্ধার হওয়া নাবালিকা শিশুদের পরিবারের সদস্যরা জানায়, তাজনিনকে শেষবারের মত গত সোমবার দুপুরে ওদের সাথে কথা বলতে দেখেছিল কয়েকজন। পরে নিখোঁজের দিন রাতে সদর থানায় আমার একটি লিখিত অভিযোগ করি। এরপরে ঘটনার জড়িত সন্দেহে পুলিশ তাজনিনের নানা মালেক (৫০) ও নানি মালেকাকে (৪৫) আটকও করে।
সুমাইয়ার খালা জানায়, আমরা দেখি যে ওই রুমে তারা তিনজনসহ মোট ১৪ জন বিভিন্ন বয়সের নারীরা আছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে কৌশলে পাচারকারী স্বামী পরিত্যক্তা তাজনিনাকেসহ তিন নাবালিকাকে চুয়াডাঙ্গাতে নিয়ে আসা হয়। নিয়ে আসার আগে দালাল আকবর তাদের নিকট থেকে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষরও করে নেয় বলে জানায় সুমাইয়ার খালা। যেন কোন আইনি পদক্ষেপ নিতে না পারে, এজন্য হুমকিও দেওয়া হয়। নানী মালেকা তার নাতিকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গাতে আসতে মানা করলেও পুলিশ কৌশলে পাচারকারী তাজনিনকে চুয়াডাঙ্গাতে নিয়ে আসে। চুয়াডাঙ্গায় ফিরে তারা থানায় গেলে পরদিন আসতে বলে।
অপরদিকে, এই প্রতিবেদক পাচারকারী তাজনিনের নিজ বাড়িতে গেলে তার নানি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। তিনি বলেন, তাজনিন বাসায় নেই। অন্য বাড়িতে আছে। তার সাথে কথা বলতে চাইলে, তিনি নানা বাহানা করে সরে পড়েন।
এঘটনায় একালাবাসী ও ভুক্তভোগীরা বলেন, এত বড় একটা ঘটনা ঘটেছে, তারা বাড়ি থাকা স্বত্ত্বেও পুলিশ কেন তাদেরকে আটক করেনি। এখন শুনছি তাজনিন গা’ঢাকা দিয়েছে।
এবিষয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. কলিমুল্লাহ বলেন, আমি ঘটনাটি শুনেছি। এই চক্রটি অনেক বড়। আমরা মামলা না নিয়ে কৌশল অবলম্বন করে তাদেরকে চুয়াডাঙ্গাতে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। তবে আগামীকাল (আজ) মামলা হবে।