আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কৃতী সন্তান কেশব চন্দ্র পাল ছিলেন সমাজসেবক ও মোটর পরিবহন ব্যবসায়ী। তাঁর উদ্যোগ, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের কারণে তিনি আজও ঝিনাইদহবাসীর কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর দান করা জমি ও ভবনের ওপর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই পরবর্তীতে তাঁর নামানুসারে ‘কেশব চন্দ্র কলেজ’ এবং সংক্ষেপে ‘কে.সি. কলেজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
কেশব চন্দ্র পাল ১৮৮৩ সালে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার দিগনগর ইউনিয়নের হড়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রামচরণ পাল এবং মাতা উষারানী পাল। তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের পেশাগত বংশীয় পদবি ‘পাল’ হলেও তিনি জাত ব্যবসায় সম্পৃক্ত না হয়ে মোটর পরিবহন ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন।
পরবর্তীতে ব্যবসার প্রয়োজন তিনি শৈলকুপার বেণীপুর বাজার থেকে আগুনিয়াপাড়ায় স্থানান্তরিত হন। পরিশ্রম করে তিনি প্রচুর ধন-সম্পত্তির মালিক হন। ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রস্থলে তিনি কারুকার্যখচিত একটি সুন্দর দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন, যেটি এখন সরকারি কেশব চন্দ্র কলেজ। ১৯১৩-১৯১৪ সালের দিকে ঝিনাইদহে রেলগাড়ি চলাচল করত। খাজুরা গ্রামের জনৈক মুন্না নাথ ‘জে. জে.’ অর্থাৎ যশোর-ঝিনাইদহ রেল কোম্পানি নামে একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করে রেলপথ সম্প্রসারণের কাজে হাত দেন।
এদিকে, ১৯৩৫ সালের দিকে কালীগঞ্জের কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে ‘বাস সিন্ডিকেট কোম্পানি’ গঠন করে যশোর-ঝিনাইদহ বাস সার্ভিস চালু করেন। রেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কম ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেওয়া করতে থাকে বাস। যশোর-ঝিনাইদহ বাস লাইন ও রেললাইন পাশাপাশি ছিল। রেলগাড়ি খুব ধীরগতিতে চলত বিধায় বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারত না।
এরপর ‘পাল’ ও ‘কুরি’ কোম্পানির বাস ঝিনাইদহের রাস্তায় নামে। রেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কম ভাড়ায় বাস চলাচল করত। এই অসম প্রতিযোগিতার ফলে ১৯৩৬ সালের দিকে লোকসানের কারণে জে. জে. কোম্পানির যশোর-ঝিনাইদহ রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরও কেশব চন্দ্র পাল কোম্পানির বাস রাস্তায় চলাচল করত।
ব্যবসার পাশাপাশি কেশব চন্দ্র পাল ছিলেন শিক্ষানুরাগী। উচ্চশিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। ১৯৬০ সালে তিনি সর্বপ্রথম ৫৩ শতক জমিসহ একটি দ্বিতল ভবন কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেন। পর্যায়ক্রমে কলেজের জমির পরিমাণ বেড়ে ৯ দশমিক ৩ একরে উন্নীত হয়। তাঁর নামানুসারে কলেজটির নাম রাখা হয় ‘কেশব চন্দ্র কলেজ’। সংক্ষেপে এটি ‘কে.সি. কলেজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮০ সালে কলেজটি সরকারি করা হয়।
কে.সি. কলেজের সঙ্গে নিজের স্মৃতির কথা উল্লেখ করে শিহাব নামে এক ছাত্র স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি এই কে.সি. কলেজের সরকারি হওয়ার পর প্রথম বিএসসি (পদার্থ, রসায়ন, গণিত) পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলাম। ওই ব্যাচের আমরা একসঙ্গে পাঁচজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হতে পেরেছিলাম। তখন পাশ কোর্স থেকে মাত্র ২০ জনকে এমএসসি করার জন্য ভর্তি করা হতো।’
শিহাব আরও বলেন, ‘এই দানের কারণে ঝিনাইদহবাসীর হৃদয়ে একটি স্থায়ী আসন দখল করে আছেন কেশব চন্দ্র পাল। উচ্চশিক্ষা বিস্তারের বিমূর্ত প্রতীক হিসেবে শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে কেশব চন্দ্র কলেজ। সেই সঙ্গে তাঁর অবদানের জন্য তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।’
১৯৬৭ সালে কেশব চন্দ্র পাল পরলোকগমন করেন। ঝিনাইদহের মানুষ কেশব চন্দ্র পালকে নিয়ে অনেক গল্প শুনেছেন, কিন্তু রেললাইন বিলুপ্তি হওয়ার নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে জানতেন না। শৈলকুপার হড়রা গ্রামের সন্তান কেশব চন্দ্র পাল তাঁর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শিক্ষার প্রসারে যে অবদান রেখে গেছেন, তার স্মারক হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে কে.সি. কলেজ। তাঁর দান করা জমি ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যদিয়ে ঝিনাইদহের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে তাঁর নাম স্থায়ী হয়ে আছে।
ঝিনাইদহ অফিস