উদ্বোধনের পর দুই মাস পার হতে চললেও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ১০ শয্যার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) প্রয়োজনীয় দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলের তীব্র সংকটে ভুগছে। উন্নত চিকিৎসার সুফল পাওয়ার আশায় রোগীরা এখানে ভর্তি হলেও চিকিৎসকদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ও সাপোর্ট স্টাফের ঘাটতি সত্ত্বেও কেবল স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় আপাতত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এই বিশেষায়িত সেবা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালেই এই আইসিইউ ইউনিটের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি সম্পন্ন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন তা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকার পর সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে এর সেবা কার্যক্রম চালু করা হয়। চালুর পর থেকেই শয্যাগুলো পূর্ণ থাকছে আশঙ্কাজনক রোগীদের দিয়ে। তবে আন্তর্জাতিক মানের আইসিইউ পরিচালনার জন্য যে ধরনের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল থাকা আবশ্যক, তা এখনো বরাদ্দ পাননি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জনবল ঘাটতি ও সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বিদ্যুৎ কুমার বিশ^াস বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে সম্প্রতি দুই মাস আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ১০ শয্যার একটি আইসিইউ উদ্বোধন করেছেন। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্যোগ এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে এখানে আইসিইউ উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকেই আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
বিশেষায়িত এই ইউনিটে ধারণক্ষমতার পুরোটা জুড়ে সবসময় রোগী ভর্তি থাকছে উল্লেখ করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আরও বলেন, ‘আজ সকালেও আমরা আইসিইউতে ১০টি শয্যায় ১০ জন রোগী দেখে এসেছি। আইসিইউ উদ্বোধনের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে আমরা কিছু মেডিকেল অফিসার এবং একজন আইসিইউ কনসালটেন্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু তা অপর্যাপ্ত। আমরা এখনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা আয়া পাইনি। স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় আমরা এসব সেবা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে এতে আমাদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।’
আইসিইউ পরিচালনার জন্য কী ধরনের বিশেষায়িত স্টাফ প্রয়োজন, তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আইসিইউর সেটআপটি একটু ভিন্ন ধরনের। এটি একটি বিশেষায়িত সেবা, যা চালিয়ে যাওয়ার জন্য দক্ষ ও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল প্রয়োজন। ক্রিটিক্যাল কেয়ার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তিনজন প্রয়োজন। তবে আপাতত দুজন পেলেও যথেষ্ট হবে। এছাড়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ও আয়া প্রায় ১৫ জন প্রয়োজন, তবে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১০ জন কর্মী পেলেও আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। সাপোর্টিং স্টাফসহ সব মিলিয়ে ন্যূনতম ২০ জন জনবল প্রয়োজন। এসব জনবল পাওয়া গেলে আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে বিশেষায়িত সেবা দিতে সক্ষম হব এবং আইসিইউ পূর্ণাঙ্গভাবে চলবে।’
বর্তমানে বিদ্যমান সীমিত জনবল দিয়ে কীভাবে দিনরাত সেবা দেওয়া হচ্ছে- এমন তথ্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইসিইউর জন্য সদর হাসপাতালের ছয়জন মেডিকেল অফিসার পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের কারো আইসিইউ প্রশিক্ষণ নেই। তাদের প্রশিক্ষণের জন্যও আমরা খুলনার পরিচালক স্যারের কাছে চিঠি লিখেছি। শুধুমাত্র একজন কনসালটেন্ট অ্যানেসথেসিয়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আছেন। এছাড়াও আমাদের নির্দিষ্ট কোনো নার্স নেই। যখন প্রয়োজন হচ্ছে, তখন সদর হাসপাতাল থেকে নার্স সরবরাহ করা হচ্ছে। ডাক্তার ও নার্সরা সমন্বয় করে আইসিইউ পরিচালনা করছেন। মোট ছয়জন ডাক্তার ও একজন আইসিইউ কনসালটেন্ট মিলে আমরা এটি চালাচ্ছি।’
চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেশিনারিজ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক জানান, অবকাঠামোগত কিছু সুবিধা থাকলেও অত্যন্ত জরুরি কারিগরি জনবল ও আধুনিক টেস্টের ইকুইপমেন্ট এখনও ঘাটতি রয়েছে। আইসিইউর ঘাটতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের আইসিইউতে মূল প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশন মেশিন, অক্সিজেন সাপোর্ট ও সিরিঞ্জ পাম্প রয়েছে। তবে একজন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার নেই, যা খুবই জরুরি। এছাড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবিজি মেশিনও আমাদের নেই। আশঙ্কাজনক রোগীর রোগ নির্ণয়ে এই মেশিনটি ব্যবহার করা হয়। তাই এটি খুবই প্রয়োজন।’
মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না জানিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসপাতাল প্রধান বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে প্রচুর চিঠি পাঠিয়েছি। তবে মৌখিকভাবে আশ্বাস পেলেও এখন পর্যন্ত লিখিতভাবে কোনো ফিডব্যাক পাইনি।’
চুয়াডাঙ্গার কৃতী সন্তান, ড্যাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের পরিচালক ডা. সায়ীদ মেহবুব উল কাদির বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত অ্যানেসথেসিওলজিস্ট, ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রশিক্ষিত নার্সিং স্টাফ অপরিহার্য। সংকটাপন্ন রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় জনবল ও এবিজি (অইএ) মেশিন সরবরাহ করা প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলব। যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করব ইনশাআল্লাহ।
নিজস্ব প্রতিবেদক