চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ভান্ডারদহ এলাকার দারুন আকরাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ৮ বছর বয়সী এক শিশুকে দীর্ঘদিন ধরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে শিশুটির সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শিশুটিকে ও তার স্বজনদের ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। এনামুল ওই মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপশি স্থানীয় এলাকায় মসজিদভিত্তিক একটি শিশু পাঠাগারেরও শিক্ষক।
এদিকে, ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমসহ লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ওই মাদ্রাসা নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসছে। ইতোপূর্বে আব্দুল মতিন নামের আরেকজন শিক্ষকও এক শিশুর সাথে এ ধরনের বাজে কাজ করলেও তাকে সেভ করা অভিযোগ নতুন করে উঠেছে।
পরিবারের অভিযোগ, মাদ্রাসার শিক্ষক এনামুল হুজুর বিভিন্ন সময়ে শিশুটির সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করতেন। বিষয়টি কাউকে জানালে শিশুটিকে মারধর এমনকি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো বলেও স্বজনদের দাবি। ভয়ে দীর্ঘদিন বিষয়টি গোপন রাখার পর সম্প্রতি শিশুটি তার মামার কাছে ঘটনাটি জানায়।
শিশুটির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই শিশুটির পারিবারিক জীবন অনেকটা অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে তার দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন মামা মেহেদী হাসান। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর শিশুটির নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
শিশুটির মামা মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমার ভাগ্নের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই। আমরা অসহায় মানুষ। অভিযোগ প্রকাশের পর বিভিন্নভাবে ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। আমার ভাগ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঘটনার সঠিক তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ‘এনামুল হুজুর আগেও একই কাজ করে ধরা খেয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিচার সালিশও বসেছে। কিন্তু এনামুলের স্বভাব বাজে। সে বারবার একই কাজ করছে। আমাদের শিশু সন্তানদের নিরাপত্তা নেই। আমরা এনামুলের বিচার চাই।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে বিষয়টি পাঁচমাইল বাজার কমিটির সদস্যদের জানানো হয়। তারা ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। তবে অভিযোগ উঠেছে এই মাসাদ্রায় ইতোপূর্বে আরেকজন শিক্ষক আব্দুল মতিনও একজন কন্যাশিশুর সাথে একই ধরনের অমানবিক আচরণ করলেও মাদ্রাসাটির সভাপতি সিরাজ হোসেন বিষয়টি নানা কৌশলে ধামাচাপা দিয়েছেন। ও শিক্ষকের বিরুদ্ধেও নেননি কোনো ব্যবস্থা। এছাড়া শিক্ষক এনামুলের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লেও দিনব্যাপী কোনো আইনগত সহায়তা বা ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিষয়টি কৌশলে মীমাংসার চেষ্টা করছেন।
তবে এসব বিষয় অস্বীকার করে দারুল আকরাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসার সভাপতি সিরাজ হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। কিন্তু ব্যবস্থা নেবার সময় পাইনি। আমি একটু ব্যস্ত আর সকাল থেকেই আজ বৃষ্টি হচ্ছে।’ এসময় তিনি দাবি করেন, তিনি কাউকে সাপোর্ট করছেন না। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি চাপা দিয়ে আমার তো কোনো লাভ নেই। শিক্ষক আব্দুল মতিনের বিষয়ে এ ধরনের কিছু জানি না। যদি কেউ বলে আমি ধামাচাপা দিচ্ছি, তাকে প্রমাণ দিতে বলেন। প্রমাণ দিলে যে শাস্তি দেবে, আমি মেনে নেব।’
অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক এনামুল হুজুরের বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে তার স্ত্রী বলেন, ‘বিষয়টি আমরা জানি না। আমার স্বামী নামাজ পড়াতে গেছেন। ফিরে আসেননি।’ চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মারুফ রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি আমরা শুনেছি, তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো অভিযোগ হয়নি। অভিযোগ হলে আমরা আইগত ব্যবস্থা নেব।’
স্থানীয়দের ধারণা, ঘটনাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত নানা ধরনের গুঞ্জন ও উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। এ কারণে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে শিশুটির শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক