চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের উদ্যোগে জেলার মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের মাঝে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এককালীন শিক্ষাবৃত্তি বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মোট ২৯২ জন শিক্ষার্থীর হাতে ১৮ লাখ ২৬ হাজার টাকার বৃত্তির অর্থ তুলে দেওয়া হয়।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, চারটি ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ১০৪ জন শিক্ষার্থীকে ৭ হাজার টাকা, প্রকৌশল (বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের ১৬ জন শিক্ষার্থীকে ৮ হাজার টাকা এবং মেডিকেল ও ডেন্টাল (এমবিবিএস ও বিডিএস) বিভাগের ২২ জন শিক্ষার্থীকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়। সব মিলিয়ে ২৯২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মোট ১৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত ও গীতাপাঠ অনুষ্ঠিত হয়। পরে অতিথি, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ফুলেল শুভেচ্ছার মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হয়। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্রের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, জীবনে সফল হতে হলে প্রত্যেকেরই একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও পরিকল্পনা থাকতে হবে। পরিকল্পনাই মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, চুয়াডাঙ্গার কতজন শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, সে বিষয়ে সমন্বিত তথ্য থাকা প্রয়োজন। জেলার শিক্ষা উন্নয়নে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা শহরে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি রয়েছে। তুলনামূলকভাবে আলমডাঙ্গার শিক্ষার মান ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, জেলার মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিকাশে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
শরীফুজ্জামান বলেন, চুয়াডাঙ্গার অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। জেলার উন্নয়নে তাদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ^াস দেন। অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানদের শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বিশ^বিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত তাদের প্রতি নজরদারি রাখতে হবে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সন্তানদের মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, এই বৃত্তি কোনো অনুদান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার একটি প্রয়াস। একজন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেলে অন্যরাও ভালো ফলাফলের জন্য অনুপ্রাণিত হবে। তিনি জানান, বৃত্তিপ্রাপ্তদের নির্বাচনে কোনো স্বজনপ্রীতি করা হয়নি; মূল মার্কশিট যাচাই করেই শিক্ষার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে চুয়াডাঙ্গায় নার্সারি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত ‘এলিট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামে একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা রয়েছে আমার। ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছে এবং আগামী মাসে শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হবে। জেলার শিক্ষা উন্নয়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. এ. কে. এম. সাইফুর রশীদ বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বহু শিক্ষার্থীর জন্য জেলা পরিষদের বৃত্তির সুপারিশ করলেও এই আয়োজন সম্পর্কে আগে বিস্তারিত জানতেন না। প্রথমবারের মতো এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পেরে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সুবিধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি জানান, এবার চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি সংখ্যাক এ বৃত্তি পেয়েছেন।
অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার তিনটি প্রধান অংশীদার হচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। এই তিন পক্ষের সমন্বয় ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবক যে সমস্যার সমাধান করতে পারেন না, শিক্ষক তা করতে পারেন। তাই অভিভাবকদের নিয়মিত সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর রাখার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ধৈর্য্য ধরে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র’ পরিচয়ের চেয়ে ‘মেধাবী’ পরিচয়ই বড়। মেধার মাধ্যমে দারিদ্র্য অতিক্রম করা সম্ভব। জন্মের সময় দরিদ্র হওয়া কারও দোষ নয়, তবে জীবনভর সেই অবস্থায় থেকে যাওয়াকে তিনি পরিশ্রম ও শিক্ষার মাধ্যমে বদলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী আনিসা খানম। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. সিদ্দিকুর রহমান, বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মুন্সি আবু সাইফ এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান। শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত ইসলাম ও নাজিফা আনজুম মুনিয়া এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিপ্লব হোসেন। অভিভাবকদের পক্ষে বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মুকছিত আল কাননের বাবা টোকন আলী।
এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম পিটু, খালিদ মাহমুদ মিল্টন, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রশিদ ঝণ্টু, জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিম, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহজাহান খান, সাধারণ সম্পাদক মোমিন মালিতাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক