চুয়াডাঙ্গায় সড়ক নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাস ও ইজিবাইকের চলাচল নিয়ে নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানানো হয়েছে জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির সভায়। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ’র আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার এবং সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নয়ন কুমার রাজবংশী।
সভায় শুরুতেই জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, ‘মানুষের স্বস্তিদায়ক বাহক এখন ইজিবাইক। চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে বিভিন্ন রুটে যেসব বাস চলাচল করে, তাদের সার্ভিস সন্তোষজনক না। অনেক বাসের ভেতরে বসার ছিটগুলোর অবস্থা খারাপ। যাত্রীদের মাথার ওপর ফ্যান আছে, কিন্তু সেগুলো অচল। প্রচণ্ড গরমে কী কারণে যাত্রীরা বাসে উঠবে? বাসের ভেতরে অনেকেই দাঁড়িয়ে যাতায়াত করে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায় ভিড়ের কারণে বাসে যাতায়াত নারীদের জন্য অস্বস্তিদায়ক। এসবের মুখোমুখির জন্য মানুষ বাসে উঠবে না। বরং যাত্রীরা কীভাবে স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ করতে পারবেন, সেটি খুঁজবে। আমি নিজে সেদিন দেখলাম বাস-মালিক সমিতির লোকজন ভ্যানের ওপর যাত্রী থাকাবস্থায় লাঠি দিয়ে ভ্যানের চাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আঘাত করছে। অল্পের জন্য সেখানে যাত্রীদের গায়ে ওই লাঠির আঘাত পড়েনি। এভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে যাত্রী নেয়ার রাইট আপনাদের নেই। লাঠি দিয়ে ভ্যানের চাকায় পেটানো হচ্ছে, এটার রাইট আপনারা কোথায় পেলেন? এটা করার রাইট আপনাকে কে দিয়েছে? এই জবাবটা বাস-মালিক সমিতিকে দিতে হবে। আপনারা কী পারেন এই স্বাধীন দেশে লাঠি দিয়ে ভ্যানে আঘাত করে যাত্রীদের জোরপূর্বক নামিয়ে বাসে ওঠাতে বাধ্য করতে? এর সন্তোষজনক ব্যাখা আমার লাগবে। আপনারা যদি আপনাদের সেবাটা সেই লেভেলে আনতে পারেন, তাহলে পাবলিক নিজেই আসবে। আপনি কেন পিটিয়ে পিটিয়ে যাত্রী ওঠাবেন?’ ইজিবাইক চলাচল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাটকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ইজিবাইকসহ অন্যান্য যানবাহন মহাসড়কে ওঠা নিষেধ, ভেতরের সড়কে চলাচলের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি এম. জেনারেল ইসলাম বলেন, ইজিবাইক, পাখিভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যাটারি লাগিয়ে চালাচ্ছে এর অধিকার কোথায়? ইজিবাইক শহরে রিকশার বিকল্প হিসেবে চলবে। তারা চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে যাত্রী নিয়ে মেহেরপুর যাওয়ার আইনগত অধিকার কোথায় পেলো? তাদেরকে বারবার নিষেধ করার পরও তারা শোনেনি। এ জন্য বাস-মালিক সমিতি ব্যবসা টিকানোর জন্য সেখানে তো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার রাস্তা রাখতেই হবে।
এর জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ব্যবসা টিকানোর নামে আপনি লাঠি দিয়ে পেটাতে পারেন না। বাংলাদেশের কোনো আইনের এই অধিকার আপনাকে দেয়া হয়নি। আপনাদের কোনো সমস্যা হলে অভিযোগ দিতে পারেন। তার মানে এই না আপনি হাতে লাঠি উঠিয়ে নেবেন, যাত্রীদের হেনস্থা করবেন, এরকম কোনো রাইট আপনাকে দেয়া হয়নি। আপনি আলোচনায় বসতে পারেন, আবেদন-নিবেদন করতে পারেন, যেসব কারণে আপনাদের ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। আপনারা কী আইন হাতে তুলে নিতে পারেন। আমার কাছে অনেক মেয়ে অভিযোগ করেছে তাদেরকে হাত ধরে টেনে হিচড়ে নামানো হয় অটো থেকে বাসে ওঠানোর জন্য।’
ইজিবাইকের লাইসেন্স প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘বিআরটিএ থেকে ইজিবাইকসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কোনো লাইসেন্স দিতে পারবে না। এ ধরনের কোনো আইন নেই। কিন্তু পৌরসভার ভেতরে চলাচলের ক্ষেত্রে অযান্ত্রিক যানবাহনের যে অনুমতিপত্র, সেটা আইন অনুযায়ী পৌরসভার আছে। যেটা সারা বাংলাদেশে করা হয়। পৌরসভাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হয় এবং কিছু রুলসের ভিত্তিতে পৌরসভা সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
বাস-মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, পৌরসভা সমস্ত গাড়ির চলাচলের অনুমতি দিক। তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের দাবি পৌরসভার মধ্যে যেসব ইজিবাইকগুলো চলবে, সেগুলোর নির্দিষ্ট রং করা, উপজেলায় যেসব চলবে, সেগুলোর আলাদা রং দেয়া, ইউনিয়নে যেগুলো চলবে, সেগুলো আলাদা রংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে পৌরসভায় যেসব ইজিবাইক চলবে, সেগুলো বাইরে যাবে না, তেমনই উপজেলার অটোগুলো পৌরসভায় ঢুকতে পারবে না। এতে পুলিশ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে রং দেখে বুঝতে পারবে।’
সাধারণ যাত্রীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, জেলার ৪টি প্রবেশদ্বার দিয়ে বাস-ইজিবাইক চলাচল করে থাকে। তাহলে কেন চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর রোডে যাত্রীদের হেনস্তার শিকার হতে হয়? এ রুটে লাঠিয়াল বাহিনীর যে আচরণ, সেটি বাস-মালিক সমিতির নেতাদের চোখে কী পড়ে না? এদিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য সভায় জেলা প্রশাসকের নিকট অনুরোধ জানানো হয়।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর সার্ভিস সন্তোষজনক না। চুয়াডাঙ্গা থেকে কোনো যাত্রী বাসে উঠলে প্রচণ্ড গরমে হিটস্ট্রোক করতে পারেন। যাত্রীরা তো স্বস্তি পেতে ইজিবাইকে উঠবেই। বাসগুলোর যাত্রী সুবিধা আগে নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রী সুবিধা করতে পারলেই তারা বাসে যাতায়াত করবে। এছাড়া দেখা যায় বাসগুলো চলাচলের ক্ষেত্রে ৫ মিনিটে ৩ জায়গায় দাঁড়ায়। এটা করতে করতে ৩০ মিনিটের পথ দেড় ঘণ্টা লাগবে। বাসগুলো স্ট্যান্ড থেকে যাত্রী তুলবে আবার পথের মাঝে মাঝে দাঁড়িয়েও এ কাজটি করা হয়। মাঝে মাঝে তো মনে হয় যাত্রীদের বাড়ি থেকে তুলে আনতে পারলে ভালো হয় তাদের। এই চিত্র যদি চেঞ্জ করতে না পারেন, তাহলে মানুষ কেন বাসে উঠবে? আবার অনেক সময় বাসে পরিপূর্ণ যাত্রী থাকলেও রাস্তার মাঝে লোক দেখলেই কীভাবে আরও নেয়া যায় সেই চেষ্টা করতে থাকে।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনেক সময় দেখা যায় ইজিবাইকে করে রোগী আনা-নেয়া করা হয়। একজন রোগী যখন তার বাড়ি থেকে হাসপাতালে আসবেন, তখন তো তিনি ইজিবাইকে করে আসবেন। তার বাড়ি পর্যন্ত তো আর বাসের সার্ভিস নেই। মুমূর্ষ রোগী এমন কী স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাদের জোর করে নামিয়ে দেয়া হয়। এটা অমানবিক। এটার সমাধান জরুরি। আবার অনেক সময় দেখা যায় বাসগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চলাচল করলেও পথের মধ্যে যাত্রী ওঠানোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। পরবর্তীতে টাইম ঠিক রাখতে তারা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চলাচল করে থাকে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, যদি বাস্তবতার সাথে মিল রেখে ইজিবাইকগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যেতো, তাহলে ভালো হতো। ইজিবাইগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, এদের জন্য প্রচুর দুর্ঘটনাও ঘটে। যে কারণে হাইকোর্ট থেকে রায় দেয়া হয়েছে। মাঝে এটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নির্দেশনা ছিল। পরবর্তীতে এগুলো এতই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে, যে কারণে আর নতুনকোনো নিদের্শনা আসে না। ঢাকার এখন যে যানজট, তার মূল কারণ এই অটোচালিত রিকশা ও থ্রি-হুইলার। আমরা এটা বলছি না যে আমাদের এটা নিয়ন্ত্রণ করার দায়-দায়িত্ব নেই। আমাদের অবশ্যই দায়িত্ব আছে। আমরা চেষ্টাও করি।’
চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘আমরা এখানে সমস্যা সমাধানের জন্য বসেছি। পাল্টাপাল্টি প্রশ্ন-উত্তর দিলে এটি সমাধান হবে না। আমরা বাংলাদেশের কথা চিন্তা না করে চুয়াডাঙ্গার কথা চিন্তা করি। এ বিষয়ে ইতোপূর্বে অনেক আলোচনা হয়েছে। আমি চুয়াডাঙ্গার নাগরিক হিসেবে এর স্থায়ী সমাধানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। এখানে বাস-মালিকদের যেমন ইনভেস্ট আছে, পক্ষান্তরে ছোট ছোট স্বাবলম্বী মানুষ ইজিবাইক কিনে তাদের জীবন ধারণ করছেন। আমরা সবাই ব্যক্তিকেন্দ্রীক নিজস্ব গন্ডির ভেতরে চিন্তা না করে সামগ্রিক সবার জন্য চিন্তা করি। জেলা প্রশাসক যদি হৃদয় দিয়ে একটু দেখেন, তাহলে মনে হয় এ সমস্যার সমাধান হওয়া সম্ভব।
এ জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন- এ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কমিটি করে দেন। সমস্যাগুলো আগে তুলে ধরতে হবে। বাস মালিকদের কী সমস্যা হচ্ছে, ইজিবাইক মালিকদের কী সমস্যা হচ্ছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করা। পৌরসভার ভেতরে যেসব ইজিবাইক চলবে, তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। উপজেলাগুলোতে ইউএনওদের দায়িত্ব দিয়ে ইজিবাইগুলোর নিবন্ধন করে তালিকা তৈরি করা। এছাড়া রোগী বহন ছাড়া বাইরের কোনো অটো পৌরসভায় ঢুকতে পারবে না। আবার অনেক সময় হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, এরকম ইজিবাইক আটকানো যাবে না। পাশাপাশি গ্রাম থেকে যারা আসছেন, বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন স্থানে যাত্রী নামিয়ে দেয়ার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। যাত্রীরা তাদের সিদ্ধান্তে চলবে। কারো অটো থেকে নামিয়ে বাসে তোলা বা বাস থেকে নামিয়ে অটোতে তোলার কোনো প্রয়োজন নেই। যারা অটোতে যাবে, তারা নির্দিষ্ট অটো স্ট্যান্ডে গিয়ে উঠবে, যারা বাসে যাবে, তারা স্ট্যান্ড থেকে উঠবে। ইজিবাইক চালক ও বাস-মালিকদের সাথে আলাদা আলাদা বসে সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। ইজিবাইককে এখন আর বাদ দেয়া সম্ভব না। ইজিবাইক বর্তমানে সারাদেশে এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে, এটা কোনো সরকারের পক্ষেই বাদ দেয়া সম্ভব না।
সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, ইজিবাইদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়া নির্দিষ্ট স্থানে বাস ছেড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বাসগুলোর ফিটনেস দেখে বিআরটিএ’র ছাড়পত্র নিয়ে রাস্তা চলাচল করতে হবে। ফিটনেসবিহীন কোনো বাস সড়কে নামতে পারবে না। এছাড়া ডোপটেস্ট ছাড়া কোনো ড্রাইভার-হেলপার গাড়ি নিয়ে চলাচল করতে পারবে না। তাদের আচরণগত পরিবর্তন আনতে হবে। অনেক সময় হেলপারদের আচরণ খারাপ হয়। এসব সমাধান না করলে বাস চলাচলের কোনো প্রয়োজন নেই। শ্রমিকদের ট্রেনিং অথবা মোটিভেশনের মাধ্যমে তাদের আচরণগত পরিবর্তন আগে প্রয়োজন। এমনভাবে আচরণ করবেন, যাতে যাত্রীরা বলবে বাসের সার্ভিস ভালো। তিনি বিআরটিএকে নির্দেশ দেন, প্রত্যেকে বাসের ফিটনেস, ড্রাইভার-হেলপারদের ডোপটেস্ট আছে কী-না এগুলো দেখে একটি একটি করে ছাড়পত্র দেবেন, তারপর সেই বাসগুলো রাস্তায় যাবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক বিভাগকে নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ইজিবাইক-থ্রি হুইলার যাতে মহাসড়কে চলাচল করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন।
সভায় এডিএমের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সভায় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার প্রশাসক ও ডিডিএলজি শারমিন আক্তার, সদর ইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) আমিনুল ইসলাম, সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান, টিআই আমিরুল ইসলাম, নিরাপদ সড়ক চাই’র সভাপতি মানিক আকবর, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনজুরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সফিকুল ইসলাম পিটু, পৌরসভার স্যানেটারি ইন্সপেক্টর নার্গিস জাহান, লাইসেন্স পরিদর্শক আব্দুল মুহাইমিন, জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিম, জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশেদুল ইসলামসহ আরও অনেকে।
নিজস্ব প্রতিবেদক