শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
দর্শনায় ভিজিএফের চাল বিতরণের তালিকায় অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ

চাল না পেয়ে হতদরিদ্র একাধিক বৃদ্ধ-বিধবার চোখে জল

  • আপলোড তারিখঃ ১২-০৩-২০২৬ ইং
চাল না পেয়ে হতদরিদ্র একাধিক বৃদ্ধ-বিধবার চোখে জল

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌরসভার ভিজিএফের চাল বিতরণে তালিকায় জটিলতা, অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পৌরসভার ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকৃত দরিদ্র, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও অসহায় অনেক মানুষ চাল না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে কিছু সচ্ছল ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরাও এই ভিজিএফের চাল পেয়েছেন, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।


পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, দর্শনা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের উপকারভোগীদের জন্য কার্ডপ্রতি ১০ কেজি করে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ১ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩৫ জনের জন্য ৩ হাজার ৩৫০ কেজি, ২ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৯০ জনের জন্য ৩ হাজার ৯০০ কেজি, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩৫ জনের জন্য ৩ হাজার ৩৫০ কেজি, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৩৩ জনের জন্য ৩ হাজার ৩৩০ কেজি, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৪২ জনের জন্য ৩ হাজার ৪২০ কেজি, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৪২ জনের জন্য ৩ হাজার ৪২০ কেজি, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ২৮৩ জনের জন্য ২ হাজার ৮৩০ কেজি, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৯৭ জনের জন্য ৩ হাজার ৯৭০ কেজি এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৩২৮ জনের জন্য ৩ হাজার ২৮০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ৯টি ওয়ার্ডে মোট ৩ হাজার ৮৫ জন উপকারভোগীর জন্য ৩০ হাজার ৮৫০ কেজি চাল বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বুধবার সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভিজিএফ’র চাল বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।


জানা যায়, গত ৩ মার্চ দর্শনা পৌর কর্তৃপক্ষ ভিজিএফের চাল সুষ্ঠুভাবে বিতরণের লক্ষ্যে ৯টি ওয়ার্ডের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একটি সভা করেন। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুত করে পৌরসভায় জমা দিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এক সপ্তাহ পার হলেও অনেক ওয়ার্ডে এখনো তালিকা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়নি। আবার কোথাও কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে পুরো কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।


এদিকে ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে চাল বিতরণের সময় দেখা যায়, তালিকায় নাম না থাকায় অনেক অসহায় মানুষ চাল পাননি। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অনেকেই বয়োবৃদ্ধ, কেউ বিধবা, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, আবার কেউ এমন আছেন, যারা চলাফেরা করতে পারেন না বা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করেন। অথচ তারাই এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।


চাল নিতে এসে তালিকায় নাম না পেয়ে অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও অসহায় নারী চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ফিরে যান। ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের দুনিয়ায় কেউ নেই। ছেলে নেই, মেয়ে নেই, স্বামী নেই। কাজ করার শক্তিও নেই। আমরা মানুষের দয়ার ওপর বা ভিক্ষা করে বেঁচে থাকি। তাহলে আমরা কেন এই চাল থেকে বঞ্চিত হবো?’


অভিযোগ রয়েছে, চাল বিতরণের সময় বিভিন্ন অনিয়মও চোখে পড়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, একজন (মহিলা) একাই ১৭টি টোকেন বা কার্ড নিয়ে ভিজিএফের চাল নিতে আসেন। বিষয়টি পৌর কর্মচারী শাহ আলমের নজরে এলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টোকেনগুলো আটক করেন। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, কিছু সচ্ছল ব্যক্তি এই ভিজিএফের চাল পেয়েছেন। যেমন কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে চাকরি করেন এমন কয়েজন ব্যক্তি এবং বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন, এমন কয়েকজনও এই চাল পেয়েছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। অথচ প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের নাম তালিকায় না থাকায় তারা চাল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, এই ধরনের ঘটনা সামাজিক বৈষম্য ও অনিয়মেরই প্রতিফলন, যেখানে প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হয়ে সচ্ছলরা সুবিধা ভোগ করছে।


স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকেই মনে করেন, পৌর কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছায় তালিকা অনুযায়ী চাল বিতরণ সুষ্ঠু হলেও যারা প্রকৃতভাবে প্রাপ্য তারা অনেকেই বঞ্চিত হয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে তালিকা তৈরির পরিবর্তে পৌর কর্তৃপক্ষ যদি নিজেরাই আগের মতো সরাসরি তালিকা প্রস্তুত করত, তাহলে হয়ত এ ধরনের জটিলতা ও বিতর্ক সৃষ্টি হতো না এবং প্রকৃত দরিদ্র মানুষও বঞ্চিত হতেন না।


এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও দর্শনা পৌর প্রশাসক শাহিন আলম বলেন, ‘আমরা পৌর কর্তৃপক্ষ চেয়েছি সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে ভিজিএফের চাল পৌঁছে দিতে। এ জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে পৌর কর্মচারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নেতৃবৃন্দকে বলা হয়েছিল ভোটার আইডি কার্ড যাচাই করে প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করে দায়িত্বপ্রাপ্ত পৌর কর্মচারীর কাছে হস্তান্তর করতে। তবে এখনো কিছু ওয়ার্ডের তালিকা সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে পুরো চাল বিতরণ শেষ করতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে।’


এদিকে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের দাবি, তালিকা পুনরায় যাচাই করে যারা সত্যিকার অর্থে এই সহায়তার যোগ্য তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত ভিজিএফের চাল বিতরণের ব্যবস্থা করা হোক। অনেকের মতে, বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করে অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বৈষম্য ও অভিযোগ থেকে যাবে।



কমেন্ট বক্স