আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। উপজেলার কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ঈদ বোনাস দেওয়া হয়। তবে এবার রোজার শুরুতেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় বেতন-বোনাস দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে কোনো বোনাস না দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে সংগৃহীত মাসিক বেতন ও প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য অভ্যন্তরীণ আয়ের কোনো অংশই সরকার গ্রহণ করে না। এই আয়ের সম্পূর্ণ অংশই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণে ব্যয় করার কথা থাকলেও আলমডাঙ্গার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা কার্যকর হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলমডাঙ্গা উপজেলার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ বেতন-বোনাস প্রদান করা হয় না। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ বেতন ও বোনাস চালু রয়েছে। যে সকল প্রতিষ্ঠানে বেতন ও বোনাস চালু রয়েছে, তার মধ্যে মুন্সিগঞ্জ একাডেমি অন্যতম। একাডেমির এক শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আছে। পূর্বে আমাদের মাসিক বেতন ও ঈদের সময় থোক বরাদ্দ হিসেবে অল্প কিছু সম্মানি দেওয়া হতো, সেটাও প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।’
উপজেলার নাগদাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জে এস মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে উৎসব ভাতা প্রদানের প্রথা চালু আছে। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের চিত্র ভিন্ন। অনেক বড় ও সচ্ছল প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ডে পর্যাপ্ত টাকা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি ‘ফান্ড নেই’ বলে সাধারণ অজুহাত দেখিয়ে শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছেন। শিক্ষকগণ আর্থিকভাবে বঞ্চিত হওয়ার ফলে তার প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে।
চলতি মার্চ মাসের ২ তারিখে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব পালনের মেয়াদ আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বৃদ্ধির জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতির স্বাক্ষরে বেতনের সরকারি অংশের (এমপিও) সঙ্গে স্কুল বা কলেজ ফান্ড হতে প্রদত্ত বেতন ভাতাদির প্রাপ্ত অংশের বিল প্রদানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার স্বাক্ষরিত নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে। নোটিশের বিষয়ে গত ৩ মার্চ চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে ফোনে কথা হয়। তিনি জানান, ‘এ ধরণের নোটিশ এখনো আমরা পাইনি। তবে আমরা প্রস্তাব করেছি বেসরকারি শিক্ষকদেরকে প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকে ঈদের আগে বেতন-বোনাস প্রদান করা হোক।’
আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ‘যে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ফান্ড থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বেতন-বোনাস প্রদানের রেজুলেশন করা আছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও গভর্নিং বডির তা প্রদান করতে পারবে। এ অর্থ প্রদানে কোনো বাধা নেই।’
শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আয় যেমন ভর্তি ফি, সেশন চার্জ বা পুনঃ ভর্তি ফি, প্রশংসাপত্র ফি এবং শিক্ষার্থীদের টিউশন বা মাসিক বেতনের টাকা বিভিন্ন খাত দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও গভর্নিং বডির সভাপতি প্রতিষ্ঠান হতে উত্তোলন করেন। কিন্তু ঈদের সময় শিক্ষকদের জন্য সেই তহবিল থেকে কোনো বেতন-বোনাস দেওয়া হয় না। ফলে উপজেলায় কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
আলমডাঙ্গার খাসকররা কলেজের সিনিয়র এক শিক্ষক বলেন, ‘সরকার ও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত টিউশন ফিস দিচ্ছে, সে টাকা শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে বিতরণ করা উচিৎ। যদি তা না হয়, তবে শিক্ষার্থীদের নিকট হতে কোনো টিউশন ফিস নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তারা (শিক্ষার্থীগণ) প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে লেখাপড়া করুক।’
এনটিআরসিএ’র মাধ্যেমে ময়মনসিংহ হতে আলমডাঙ্গা উপজেলার এম এস জোহা কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত ফখরুল হাসান বলেন, ‘বাড়ি হতে অনেক দূরে চাকরি করছি, মূল বেতনের মাত্র ৭.৫% বাড়ি ভাড়া ও ঈদের সময় মূল বেতনের মাত্র ৫০% উৎসব ভাতা সরকার প্রদান করে, যা দিয়ে না পারি বাড়ি ভাড়া দিতে, না পারি পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে। দিন দিন জীবনযাত্রা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের কোনো আয় যেহেতু সরকার নেয় না, সুতরাং সে আয় হতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে উৎসব ভাতা হিসেবে দিলে জীবনযাত্রা একটু সহজ হবে।’
এনটিআরসিএ’র তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যেমে টাঙ্গাইল হতে আলমডাঙ্গা উপজেলার নিগার সিদ্দিক ডিগ্রি কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত সোহেল রেজা নামে এক শিক্ষক জানান, ‘বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে সরকারিভাবে প্রাপ্ত ৫০ শতাংশ বোনাস দিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারে ঈদের নতুন পোশাক ও একটু ভালো খাবার আয়োজন করা অসম্ভব। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় যেহেতু সরকার নেয় না, সেহেতু সেই আয়ের একটি অংশ শিক্ষকদের মধ্যে মাসিক বেতন ও ঈদ বোনাস হিসেবে প্রদান করলে শিক্ষকগণ একটু স্বস্তি পেত।’
আলমডাঙ্গার অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটি ফান্ডে টাকা নেই অজুহাত দেখিয়ে শিক্ষকদের সাথে এক ধরনের প্রতারণা করছেন বলে সাধারণ শিক্ষকরা মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে উপজেলার সচেতন শিক্ষক সমাজ ও সংশ্লিষ্টরা অনতিবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ফান্ড থেকে শিক্ষকদের মাসিক বেতন ও উৎসব ভাতা প্রদানে উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিসের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। যাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২ মার্চের নির্দেশনানুযায়ী সকল শিক্ষক সপরিবারে আনন্দের সহিত ঈদ উদ্যাপন করতে পারেন।
প্রতিবেদক, আলমডাঙ্গা