আলমডাঙ্গা উপজেলায় ডিএপি সারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জেহালা, ভাংবাড়িয়া ও হারদী ইউনিয়নে সংকটটি প্রকট আকার ধারণ করেছে। সার সংগ্রহ করতে ভোররাত থেকেই মুন্সিগঞ্জ পশুহাট এলাকার বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার উম্বাদ আলী জোয়ার্দ্দারের দোকানে কৃষকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীত উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক কৃষক চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নে এক সপ্তাহ আগেও একই চিত্র দেখা গেছে। সর্বশেষ গত সোমবার হারদী বাজার এলাকায় ডিএপি সার না পাওয়াকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে মারামারির ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় উপজেলার কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, চলতি মৌসুমে ধান, গম, ভুট্টা, পান ও বিভিন্ন শাক-সবজির জন্য যে পরিমাণ ডিএপি সার বরাদ্দ রয়েছে, সেটিই কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট তিনটি ইউনিয়নে গত বছরের তুলনায় তামাক চাষ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত সারের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকৃত খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী কৃষকদের মধ্যে সারের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেহালা ইউনিয়নের গড়চাপড়া ও গড়গড়ি গ্রামে ব্যাপক হারে তামাক চাষ হচ্ছে। তামাক চাষে তুলনামূলকভাবে বেশি ডিএপি সারের প্রয়োজন হয়। সরকারিভাবে তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করা হলেও এবং এ খাতে সারের কোনো বরাদ্দ না থাকলেও অধিক লাভের আশায় অনেক কৃষক তামাক চাষে ঝুঁকছেন। এতে সাধারণ খাদ্যশস্য চাষিরা প্রয়োজনীয় সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে মুন্সিগঞ্জ পশুহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের সারির দৈর্ঘ্যও বাড়ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষকদের চোখেমুখে হতাশা স্পষ্ট। তাঁদের অভিযোগ, কিছু তামাক চাষি প্রভাব খাটিয়ে কিংবা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বেশি পরিমাণ সার সংগ্রহ করছেন। এর ফলে রবি মৌসুমে গম, ভুট্টা, ডাল ও সবজি চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কয়েকজন কৃষক জানান, তামাক কোম্পানিগুলোর আগাম অর্থ ও বীজ সরবরাহের প্রলোভনে তামাক চাষ দিন দিন বাড়ছে। এতে বরাদ্দের তুলনায় সারের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগী কৃষকেরা তামাক চাষে সারের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রকৃত খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী কৃষকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তা না হলে চলতি মৌসুমে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
জেহালা ইউনিয়নের গড়চাপড়া গ্রামের কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘এ এলাকায় অনেকেই তামাক চাষ করেন। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় তারা দিনমজুর দাঁড় করিয়ে লাইনে সার সংগ্রহ করছে। এতে প্রকৃত কৃষকেরা সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত তদারকি না বাড়ালে সংকট আরও বাড়বে।’
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ পলাশ বলেন, ‘তিনটি ইউনিয়নে এবারও তামাক চাষ বেড়েছে। তামাক চাষের জন্য সরকারি কোনো সার বরাদ্দ নেই। কিন্তু কিছু চাষি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সার সংগ্রহ করায় খাদ্যশস্য চাষিদের মধ্যে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।’ তিনি জানান, প্রকৃত কৃষকদের মাঝে সার বিতরণ নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ সার্বিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, চুয়াডাঙ্গার কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ডিএপি সারের সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
সমীকরণ প্রতিবেদক