চুয়াডাঙ্গায় কয়েক সপ্তাহ যাবত দিন ও রাতের তাপমাত্রা ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমছে। ডিসেম্বরের শুরুতেই এ জেলার তাপমাত্রা নেমে গেছে ১৫ ডিগ্রির নিচে। এরই মাঝে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে বেড়েছে শীতজনিত রোগ নিয়ে চিকিৎসা প্রত্যাশীদের ভীড়। সবচেয়ে রোগী ভর্তির ভয়াবহতা দেখা যাচ্ছে সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। এ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ১৮৫৩ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী। ৫ জন ধারণ ক্ষমতার এ ওয়ার্ডে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভর্তি ছিল ১০৯ জন। যা ধারণ ক্ষমতার ২০ গুণেরও বেশি। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশ শিশু। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়েও ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বারান্দায়ও ভর্তির রোগীকে থাকতে হচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য মতে, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গত নভেম্বর মাসের ১৪ তারিখে ৩১ জন, ১৫ তারিখে ৩৮ জন, ১৬ তারিখে ২৮ জন, ১৭ তারিখে ৩৭ জন, ১৮ তারিখে ৩৫ জন, ১৯ তারিখে ৪০ জন, ২০ তারিখে ৩৫ জন, ২১ তারিখে ৫২ জন, ২২ তারিখে ৫৫ জন, ২৩ তারিখে ৫৩ জন, ২৪ তারিখে ৪২ জন, ২৫ তারিখে ৫৫ জন, ২৬ তারিখে ৪২ জন, ২৭ তারিখে ৪৬ জন, ২৮ তারিখে ৪৩ জন, ২৯ তারিখে ৫৪ জন ও ৩০ নভেম্বর ৫৯ জন ভর্তি হন।
এছাড়া চলতি ডিসেম্বর মাসে রোগীর চাপ আরও বেড়ে যায়। চলতি মাসের ১ তারিখে ৬২ জন, ২ তারিখে ৭৫ জন, ৩ তারিখে ৭৯ জন, ৪ তারিখে ৭৯ জন, ৫ তারিখে ৮৮ জন, ৬ তারিখে ৯১ জন, ৭ তারিখে ৮৯ জন, ৮ তারিখে ৯৭ জন, ৯ তারিখে ৭১ জন, ১০ তারিখে ৬৮ জন, ১১ তারিখে ৭৪ জন, ১২ তারিখে ৮৮ জন ও ১৩ ডিসেম্বর ১০৯ জন ভর্তি হন। গত এক মাসে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের বহিঃবিভাগে সেবা নিয়েছে প্রায় ৩ হাজার রোগী। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২৫০-৩০০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসছে। এদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় নার্সদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে একজন নার্সের জায়গায় বর্তমানে দুইজন নার্স কাজ করছেন। রোগীর চাপ বৃদ্ধির জন্য প্রতি শিফটে দুইজন করা হয়েছে।
গতকাল রোববার হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দেখা যায়, জায়গার সংকট থাকলেও নার্সরা চিকিৎসাসেবা অব্যহত রেখেছেন। তবে রোগীর স্বজনদের অনেকেই অতিরিক্ত ভিড় এবং চিকিৎসা সেবায় কিছুটা ধীরগতির অভিযোগ করেছেন। নার্সরা বলছেন, রোগীর চাপ বাড়ছে, কিন্তু জনবল সংকটের কারণে অতিরিক্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার কুলচারা গ্রামের ওয়ালিদ হাসান তার ৫ মাস বয়সী ডায়রিয়া আক্রান্ত কন্যাশিশুকে ভর্তি করিয়েছেন ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। তিনি সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট হলেও হাসপাতালে ভর্তি থেকে সেবার পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, এখানে নোংরা আর দুর্গন্ধ, তবে নার্সরা সার্বক্ষণিক আমার বাচ্চাকে দেখভাল করছে। কিন্ত অতিরিক্ত রোগীর চাপ।
হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ১ বছর বয়সী কন্যাশিশুর বাবা তাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভেতরে জায়গা নেই, তাই আমরা বারান্দায় আছি। রাতে প্রচুর ঠান্ডা পড়ে, শীত লাগে। আমার মেয়ে তিন দিন ধরে এখানে ভর্তি রয়েছে। আগের থেকে এখন সুস্থ আছে। তবে ডাক্তার বলেছে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।’
ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি আরেক রোগী এক বছর বয়সী আব্দুর রহমানে মা পৌর এলাকার দিগড়ী গ্রামের ফাতেমা খাতুন বলেন, বাচ্চার ঘনঘন পায়খানা হচ্ছে। পেট ব্যথা আর বমি। বাচ্চা নিয়ে খুব দুর্ভোগেই আছি। তবে রোগীর এত চাপ, নার্সদেরই বা কি বলবো তারাও তো চেষ্টা করছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স রাণী বেগম সময়ের সমীকরণকে বলেন, ‘৫ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে রোগী ভর্তি ১০৯ জন। প্রতি শিফটে একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স থাকার কথা থাকলেও আমরা দুইজন সিনিয়র স্টাফ নার্স ডিউটি করছি। আপনারাই বলেন, ২ জন মানুষ কি ১০০ জন মানুষকে সেবা দিতে পারবে? তবুও আমরা চেষ্টা করছি যেন কোনো রোগীর সেবায় ত্রুটি না থাকে।’ ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স নাজমুন নাহার তৃষ্ণা বলেন, কয়েক সপ্তাহে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে। আক্রান্তদের ৯০ ভাগই শিশু। তবে ওয়ার্ডে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত স্যালাইনসহ ওষুধপত্র আছে।
সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন সময়ের সমীকরণকে বলেন, শিশুদের রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং অনিরাপদ খাবারও ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে সঠিক স্যালাইন প্রয়োগের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আরএমও ওয়াহিদ মাহমুদ রবিন সময়ের সমীকরণকে বলেন, শীতকে কেন্দ্র করে শীতজনিত রোগীর চাপ বেড়েছে। রোটা ভাইরাসজনিত কারণে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর এ ব্যাপকতা। এটা প্রতিবারই হয়। আমরা চিকিৎসা প্রত্যাশীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আবার অনেক রোগী বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডের রোগীর চাপ সপ্তাহখানেক ধরে বেড়েছে। আমাদের জনবল সংকট কিন্তু আমরা এই স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা নেওয়ার চেষ্টা করছি।
প্রধান সম্পাদক