সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

চুয়াডাঙ্গার আলুকদিয়ায় পাঁচটি অবৈধ জৈব সার কারখানা, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

দূষণে পরিবেশ বিপর্যয়, কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
  • আপলোড তারিখঃ ১৪-১২-২০২৫ ইং
চুয়াডাঙ্গার আলুকদিয়ায় পাঁচটি অবৈধ জৈব সার কারখানা, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

জৈব কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব সারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সুযোগ নিয়ে চুয়াডাঙ্গার আলুকদিয়া ইউনিয়নে গত কয়েক মাসে পাঁচটি ছোট-বড় ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) ও অন্যান্য জৈব সারের কারখানা গড়ে উঠেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই উদ্যোগ গতি আনলেও কারখানার অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও সার লাইসেন্স না থাকায় আশেপাশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক না হওয়ায় সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়েছে, যা স্থানীয়ভাবে বড় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হওয়া সত্ত্বেও আয়কর বা মূল্য সংযোজন কর (vat) সরকারের কোষাগারে সঠিকভাবে জমা না দেয়ায় একদিকে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।


সরেজমিনে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া ইউনিয়নে কৃষি খামার, মর্ডান এগ্রো ফার্ম, চুয়াডাঙ্গা এগ্রো কম্পোস্ট, চুয়াডাঙ্গা ভার্মি কম্পোস্ট ও মা এগ্রো নামে পাঁচটি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন করতে দেখা যায়। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় বিপুল খোলামেলা পরিবেশে কাঁচা গোবর ও জৈব পদার্থ খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে।


চুয়াডাঙ্গা এগ্রো কম্পোস্ট ও চুয়াডাঙ্গা ভার্মি কম্পোস্ট-এর স্বত্ত্বাধিকারী এরফান বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি আবেদন করেছি। তবে এখনো লাইসেন্স নেই।’ মর্ডান এগ্রো ফার্মের স্বত্ত্বাধিকারী সেলিম বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিয়েছি। লাইসেন্স পাওয়া নিয়ে ঝামেলা। মাজিন এগ্রো আমাদের থেকে কিনে নিয়েছে।’


মাজিন এগ্রোর মার্কেটিং ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে রেজাউর রহমান বলেন, ‘আমাদের ঢাকায় অনুমোদন আছে। আমরা দেশের যেখানে ইচ্ছা, সেখানে উৎপাদন করতে পারি।’ এসময় তার কাছে চুয়াডাঙ্গায় উৎপানের অনুমতি আছে কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘আপনি কি জানেন, এই অনুমোদন কতটা জটিল। চালু না রেখে অনুমোদন পাওয়া যায় না। আমরা করে ফেলবো।’


ওই এলাকার ‘কৃষি খামার’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী আশরাফুল বলেন, ‘আমরা বহু কষ্টে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছি। এতো নিয়ম আইন জানি না। এখন সরকার বন্ধ করতে বললে বন্ধ করে দেব। আমাদের সাথে একজন কৃষিবিদ আছে। তার সাথে কথা বলেন।’ এসময় ঢাকার খামারবাড়ির কৃষিবিদ আসাবুল নামে পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি মুঠোফোনে জানান, ‘অনুমোদন সহজ নয়। আমি ব্যবসা আরও করি, আমার গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার নীলমণিগঞ্জে। আমি ঢাকা খামারবাড়ির কৃষিবিদ। অনুমোদন আমি দেখব। দ্রুতই করে ফেলবো। আবেদনের প্রক্রিয়ায় আছি।’ এসময় তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে ছাড় দেয়ার অনুরোধ করেন।


সরেজমিনে দেখা যায়, অননুমোদিত কারখানাগুলো সাধারণত দ্রুত লাভের আশায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড অনুসরণ করছে না। ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির প্রধান উপাদান হলো গোবর এবং অন্যান্য জৈব বর্জ্য। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না করলে এই কাঁচামাল এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ পরবর্তী অব্যবস্থাপিত বর্জ্য সরাসরি পরিবেশে মিশে যাচ্ছে। কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য (খবধপযধঃব) সরাসরি নিকটস্থ পুকুর, খাল বা কৃষি জমিতে ফেলার কারণে ভূ-পৃষ্ঠের জল এবং মাটির মারাত্মক দূষণ ঘটছে। এই বর্জ্যে উচ্চ মাত্রার অ্যামোনিয়া ও নাইট্রেট থাকতে পারে, যা জলজ প্রাণীর ক্ষতি করে এবং মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। কাঁচা গোবর ও জৈব পদার্থ খোলা জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে স্তূপ করে রাখলে বা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে তা পচনের সময় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। এই গ্যাসীয় নিঃসরণ বায়ুর গুণমান নষ্ট করে এবং আশেপাশের মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে।


অব্যবস্থাপিত বর্জ্য মশা-মাছির জন্মস্থান হিসেবে কাজ করছে। কেঁচো সারের স্তূপ মশা ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে, যা আশেপাশের এলাকায় টাইফয়েড, ডায়রিয়া, এবং ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্গন্ধ এবং পরিবেশ দূষণের কারণে কারখানা পরিচালনাকারীদের সাথে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায়শই বিরোধ তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে।


সার (ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০০৬ এর ধারা ৮ অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন (লাইসেন্স) না নিয়ে কোনো ধরনের সার উৎপাদন বা বাজারজাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অননুমোদিত উৎপাদনের কারণে সারের গুণমান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে জল ও বায়ু দূষণ এই আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।


অনুমোদনহীন এই জৈব ও ভার্মি কম্পোস্ট কারখানাগুলোতে উৎপাদিত সারের বাজার চাহিদা বিপুল হওয়ায়, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু এই সকল অননুমোদিত এবং নিবন্ধনবিহীন কারখানাগুলোর বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণভাবে সরকারের নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট (vat) নিবন্ধন এবং টিআইএন (Taxpayer Identification Number) না থাকার কারণে এই লাভজনক ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর প্রযোজ্য কোনো ধরনের আয়কর বা মূল্য সংযোজন কর (vat) সরকারের কোষাগারে জমা পড়ছে না। এর ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বৈধভাবে নিবন্ধিত এবং আইন মেনে চলা অন্যান্য সার উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছেন, যা দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও ন্যায্য ব্যবসায়ী পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে।


আলুকদিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, ‘এগুলো সারাদিন কাজ করে। চারিদিকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। গ্রামের মধ্যেও এই কারখানাগুলো রয়েছে। ট্রাক ট্রাক সার বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভালো না। পরিবেশের ক্ষতি করছে।’


চুয়াডাঙ্গার পরিবেশ কর্মী ও চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শেখ সেলিম বলেন, ‘জৈব সার ভালো। কিন্তু ভালো করতে গিয়ে খারাপ করলে হবে না। আমরা জৈব ও ভার্মি সারের ব্যবহার বাড়াতে চাই। বৈধ ও অনুমোদিত কারখানা প্রয়োজন। গ্রামের মধ্যে বসতিদের কষ্ট দিয়ে দুগর্ন্ধযুক্ত কারখানা চালু রাখা উচিত নয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হলে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হচ্ছে কি না, সেটাও জানা প্রয়োজন।’



কমেন্ট বক্স
notebook

চুয়াডাঙ্গা জেলা খেলাফত মজলিসের সেক্রেটারি জুবায়ের খানের সঙ্গে