সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

চুয়াডাঙ্গায় ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ শীর্ষক সেমিনার

সংস্কৃতির ভিত্তি সুরক্ষায় ঐক্যের আহ্বান
  • আপলোড তারিখঃ ১৩-১২-২০২৫ ইং
চুয়াডাঙ্গায় ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ শীর্ষক সেমিনার

বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও মননশীলতার চর্চায় বর্তমানে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। দৈনিক সময়ের সমীকরণ পত্রিকার আয়োজনে ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ শীর্ষক এই মতবিনিময় গতকাল শুক্রবার বিকেলে শহরের পুলিশ পার্ক লেনে পত্রিকাটির প্রধান কার্যালয়ের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারে দেশের সাংস্কৃতিক পটভূমি, বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।


দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল মোহিত। তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য ও বিশ্লেষণ সেমিনারের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।


সেমিনারের শুরুতেই দৈনিক সময়ের সমীকরণ কর্মী সাংবাদিক মেহেরাব্বিন সানভী স্বরচিত মূল প্রবন্ধ ‘সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি’ পাঠ করেন। প্রবন্ধে উঠে আসে, বহুত্ববাদী ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ভিত্তি নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন মত ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিল্পী ও বাউলদের হেনস্তা এবং কখনো কখনো আক্রমণের ঘটনা সমাজের মননশীলতার উপর আঘাত হানছে।’


চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘এখনকার পাঠ্যক্রমে শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পাঠ্যসূচিতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত কোনো কোনো বিষয় সংস্কৃতির সঠিক ধারাকে বিকৃত করতে পারে। সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনে এখনই সময় শুদ্ধ সংস্কৃতি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া। দল-মত নির্বিশেষে সকলকে সাংস্কৃতিক চর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সংস্কৃতির ভুল ধারায় প্রভাবিত হতে পারে।’
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল মোহিত সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবতাবাদের ভিত্তি রয়েছে, তা সুরক্ষায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক কর্মীরা সমাজের বিবেক। তাঁদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।’


তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতির বয়স হাজার বছরের বেশি। আমাদের মধ্যযুগ থেকে আধুনিক বিশ্বে এসে পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন ঘটলো। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিকাশ ঘটলো, শিল্প বিপ্লব ঘটলো এবং রেনেসার আবির্ভাব হলো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ থেকে তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত গ্রীক অঞ্চলে অনেক জ্ঞানী-গুণী পন্ডিতের আগমন ঘটে। তারপর কালের নিয়মে সে চর্চা স্থগিত হয়ে যায়, শেষ হয়ে যায়। তারপর চতুর্দশ শতাব্দীর এই দিকে এসে ইটালিতে বহু জ্ঞানী-গুণীর জন্ম হয়। তখন মনে হলো ঐ গ্রীকের পন্ডিতেরা আবার ফিরে আসলো।’
দৈনিক সময়ের সমীকরণ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন সভাপতির বক্তব্যে সংস্কৃতির ভিত্তি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি আমাদের জীবনের অংশ এবং জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয়ের মূল ভিত্তি। আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর আরও বেশি জোর দিতে হবে। প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি তরুণদেরও সংস্কৃতিতে সম্পৃক্ত করতে হবে। সংস্কৃতির মজবুত ভিত্তি গড়তে হলে জেলার সকল সংস্কৃতিমনা কর্মী, লেখক, কবিসহ স্থানীয় প্রবীণদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’


খোদাবকস শাহ স্মৃতি পরিষদের সভাপতি আব্দুল লতিফ শাহ চুয়াডাঙ্গার লোকগীতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা সংস্কৃতি চর্চার ভূমি। আউল, বাউল, জারি, সারি ও লোকগীতির ভান্ডার এখানে রয়েছে। আধুনিক কায়দায় সংস্কৃতি ধ্বংসের চেষ্টা চলছে এবং আমরা ধ্বংসের অনেকটাই দ্বারপ্রান্তে। এই সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে একটি বৃত্তের মাঝে এসে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ালে তবেই সংস্কৃতি টিকবে।’


অনির্বান থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আজকের সেমিনারের শিরোনাম “সংকটের আবর্তে সাংস্কৃতিক ভূমি” অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা দেখছি, মুক্তবুদ্ধি ও লোকায়ত সাংস্কৃতিক চর্চা নানামুখী চাপের মুখে। এই সংকট শুধু শিল্পের নয়, আমাদের সামাজিক ও মানবিক ভিত্তির। সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে রক্ষা করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে সকল সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। তরুণ প্রজন্মকে শুদ্ধ সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে এনে এই ঐতিহ্যবাহী ভূমিকে রক্ষা করাই আমাদের প্রধান কাজ।’


সেমিনারে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন দৈনিক সময়ের সমীকরণের সাহিত্য সম্পাদক কাজল মাহমুদ, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য অ্যাড. বজলুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা আবৃত্তি পর্ষদের পরিচালক মনোয়ারা খুশী, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লিটু বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শেখ সেলিম, চুয়াডাঙ্গা লেখক সংঘের আবুল কালাম আজাদ, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সেলিম, শহর বাউল একাডেমির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নবাব আলী শাহ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চুয়াডাঙ্গা জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক আদিল হোসেন, অনির্বান থিয়েটারের কবিরুল হক লিপু, চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের সদস্য গুরু কাজল মল্লিক, দর্শনা বাউল পরিষদের সভাপতি মনিরুজ্জামান ধীরু, অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠন চুয়াডাঙ্গার সভাপতি মো. আলা উদ্দিন, কথা সাহিত্যিক পিণ্টু রহমান, অরিন্দম চুয়াডাঙ্গার সাধারণ সম্পাদক হিরন উর রশিদ শান্ত, চর্চায়ন কর্মী রিগ্যান এসকান্দার, অনির্বাণ থিয়েটারের নির্বাহী সদস্য মো. আওয়াল হোসেন, দর্শনার অনির্বাণ কর্মী আজাদুল ইসলাম, দর্শনার অনির্বাণ কমী ইফতেখার আলম, দর্শনা আনন্দধামের মোস্তাক আহমেদ, অনির্বাণ থিয়েটার কর্মী সাজ্জাত হোসেন, দর্শনা উদীচীর আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন, জেলা শিল্পী কল্যাণ পরিষদের মতিউর রহামান, শরীরচর্চা শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা সংলাপ ও সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নজির আহমেদ, অরিন্দম চুয়াডাঙ্গার সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মানিক, অরিন্দম চুয়াডাঙ্গার সাহিত্য প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুমিতা দে, অরিন্দম কর্মী ভারতী হালদার প্রমুখ।


বক্তারা একমত হন যে, এই জটিল প্রেক্ষাপটে দেশের সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজকে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে সচেতন ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনা শুরু করা অপরিহার্য। রাষ্ট্রের উচিত হবে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজের গভীরে অসহিষ্ণুতার কারণগুলো অনুসন্ধানে মনোযোগ দেওয়া।



কমেন্ট বক্স
notebook

চুয়াডাঙ্গা জেলা খেলাফত মজলিসের সেক্রেটারি জুবায়ের খানের সঙ্গে