আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে পর্দার আড়ালে চলছে নানামুখী খেলা। এই খেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। এতে ছোট দলগুলোর কদর বেড়েছে। দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো ইসুতে সরব না থাকলেও ইলেকশন এলেই এই দলগুলোর তৎপরতা বেড়ে যায়। জোট গঠন, আসন সমঝোতাসহ বিভিন্ন শর্ত নিয়ে চলে দর কষাকষি। এগিয়ে আসছে ইলেকশনের দিন। নানামুখী জোটের আলোচনা জোরদার হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে তৃতীয় শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েকদিন ধরে আলোচনা চলছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বে গঠনের চেষ্টা চলছিল আরেকটি জোট। তবে এ প্রক্রিয়া শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ নেতাদের দলটির অন্তরকোন্দলেই ভেস্তে যেতে বসেছে সমঝোতার পুরো প্রক্রিয়া। এর পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা দুই ছাত্র উপদেষ্টার আপত্তিই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, এনসিপির বেশির ভাগ সিনিয়র নেতাই বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনে আগ্রহী। এ নিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন এনসিপির নেতারা। শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে এনসিপি জোট করতে পারে বলে দুই দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি সবসময় ইলেকশনমুখী দল। ফেব্রুয়ারির ইলেকশনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। তারা তাদের দাবি-দফা দিচ্ছে। আমরা তাদের দাবি-দফা নিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করছি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে নির্দেশনা দিচ্ছেন, আমরা সেই সেই নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করছি।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আমাদের আলোচনা অব্যাহত আছে। তবে, এখন পর্যন্ত কোনো জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়নি। ইলেকশনের আগে সবকিছু পরিষ্কার হবে।’ ফেব্রুয়ারির ইলেকশনকে সামনে রেখে জোট গঠনে তৎপর এনসিপি। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা নাহিদ ইসলামের বাসায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে। সেখানে জোট গঠন ও কয়েকটি বিকল্প পথ নিয়ে কথা হয়। কয়েকটি দলের এক সঙ্গে ইলেকশন করার বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠক চলাকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশকে জোটে নেয়ার প্রস্তাব আসে। এই প্রস্তাব ওঠার পরই আলোচনার পরিবেশ বদলে যায় এবং মাঝপথে বৈঠক থেমে যায়। বৈঠকে উপস্থিত ৪০ নেতার মধ্যে মাত্র তিনজন ‘আপ বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে জোট করার পক্ষে মত দেন। বাকিরা কেউ বিএনপির সঙ্গে জোট করতে চান, আবার কেউ স্বাধীনভাবে ইলেকশনে যাওয়ার মত দেন।
এনসিপির নেতারা জানান, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তারা বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার প্রশ্নই আসে না। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, জোট নিয়ে এই মতবিরোধ শেষ সময়ে গিয়ে দলটিকে ভাঙনের মুখে ফেলতে পারে। পরিস্থিতি কেমন দাঁড়ায় তা এখন দেখার অপেক্ষা। জানা গেছে, এনসিপির নির্বাহী কাউন্সিলের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি শীর্ষ নেতারা। সম্ভাব্য জোটে এনসিপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া নেতাদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আপ বাংলাদেশ থাকলে সে জোটে যাওয়ার বিরোধিতা করেন দলের অনেক নেতা। এ কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে জোট গঠন। এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জোটে যাওয়ার ব্যাপারে দলের মধ্যে দ্বিমত আছে। এর নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া দুই ছাত্র নেতা, যারা বর্তমান সরকারে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। তারা আপ বাংলাদেশকে নিয়ে জোট গঠনে মোটেও রাজি নন। বরং তারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য জোটের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে আগ্রহী। নতুন জোট গঠনের বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, ‘আপ বাংলাদেশ যেহেতু রাজনৈতিক দল নয়, সে কারণে আমরা তাদের সঙ্গে জোট গঠনের ব্যাপারে আগ্রহী নই। তবে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য এনসিপি আরো কিছুটা সময় নিতে চায়।’
দলটির যুগ্ম সদস্য সচিবআবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে একমত হয়ে এনসিপি রাজনৈতিক জোট গঠনে আগ্রহী। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাও চলছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট হতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে তারা জোট গঠনে আগ্রহী নন। তিনি আরো বলেন, বৈঠকে অধিকাংশ সদস্য আপ বাংলাদেশের সঙ্গে জোট গঠনের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন। এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাহী কাউন্সিলে যেসব সদস্য নতুন জোটে যাওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন, তারা প্রায় সবাই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের অনুসারী। তাদের অনুসারীদের পাশাপাশি আরো কয়েক সদস্য আপ বাংলাদেশের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করেন। এনসিপি গঠনের আগে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া নেতাদের নিয়ে যে নাগরিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তার প্রভাবশালী নেতা ছিলেন আপ বাংলাদেশের আলী আহসান জুনায়েদ ও রাফে সালমান রিফাত। তারা এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে দল পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন। এ কারণে এখন নতুন করে তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার বিরোধিতা করছেন এনসিপির অধিকাংশ নেতা। তবে অনেকে এ ব্যাপারে নমনীয় নীতি নেয়ার পক্ষে।
এনসিপির নির্বাহী কাউন্সিলের এক সদস্য বলেন, আপ বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধকে সামনে এনে তৃতীয় জোট গঠনের প্রক্রিয়া ভেস্তে দেয়ার চেষ্টা চলছে। তার মতে, দলের ভেতরে ও বাইরের প্রভাবশালী কেউ কেউ চান বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যেতে। তাদের অনেকে হয়তো চাইছেন না তৃতীয় কোনো জোট হোক। আপ বাংলাদেশের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গঠনের বিষয়ে প্রায় তিন মাস ধরে আলোচনা চলছে। আপ বাংলাদেশ যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে আছে, তা এনসিপি নেতাদের অজানা ছিল না। শেষ মুহূর্তে এসে এ ধরনের দাবি বিস্ময়কর। এর পরও জোট গঠনের ব্যাপারে দল আশাবাদী। এক সময় বিএনপির সঙ্গে জোটভুক্ত এবং পরবর্তী সময়ে সমমনা রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী শাসনামলে রাজপথে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইলেকশন সামনে রেখে বেশ কিছু দলের পক্ষে একক প্রার্থী দেয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এরই মধ্যে আটটি রাজনৈতিক দল নিয়ে বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে সরব রয়েছে। দলগুলোর এ প্রক্রিয়াকে জামায়াত জোট না বলে নির্বাচনী সমঝোতা বলছে। এই প্রক্রিয়ায় জামায়াতের সঙ্গে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, নেজামে ইসলাম পার্টি। ইলেকশন ঘিরে এই প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে আরো বেশ কিছু দল দল তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই সমঝোতায় সবদলের পক্ষে একজন প্রার্থী থাকবেন।
বামপন্থিদের বৃহত্তর জোট আত্মপ্রকাশ হতে পারে। যুক্তফ্রন্টের আদলে বাম ঘরানার কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে নতুন একটি জোট গঠন হবে। আজ-কালের মধ্যে এই জোটের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। এই জোট ৩০০ আসনে ভোটের লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছয়টি বাম দল নিয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ বৃহত্তর এ জোট গঠনের মূল উদ্যোক্তা। বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী)।
সমীকরণ প্রতিবেদন