সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
জীবননগরে নির্মাণাধীন ব্রিজ ও সংযোগ সড়কে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ

ব্রিজ নয়, যেন বিপদের ফাঁদ! প্রশস্ত নদী সরু হয়ে এখন খাল

অনিয়মের প্রতিবাদ করায় গ্রামবাসীর নামে থানায় ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগ দায়ের
  • আপলোড তারিখঃ ১৮-১১-২০২৫ ইং
ব্রিজ নয়, যেন বিপদের ফাঁদ! প্রশস্ত নদী সরু হয়ে এখন খাল
* প্রকল্প মূল্য: ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৩ টাকা
* ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান: জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড
* রাস্তার গাইড পিলার হাতেই নড়ে ও ভেঙে পড়ে
* রাস্তার দুপাশে ব্লক/গাইডওয়ালের বদলে বাঁশ ও কলাগাছ
* জমি দান করেও মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি
* অনিয়মের প্রতিবাদে এলাকাবাসীর মানববন্ধন
* ব্রিজ সংক্রান্ত সংবাদ না করার অনুরোধ নির্বাহী প্রকৌশলীর


চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মাধবপুর গ্রামে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মাণাধীন ব্রিজ ও সংযোগ সড়কের কাজে অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৩ টাকার এই প্রকল্পের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে গতকাল সোমবার দুপুরে গ্রামবাসী মানববন্ধন করেন। স্থানীয়রা জানান, মাধবপুর-বালিহুদা ভৈরব নদের ওপর নির্মিতব্য ব্রিজ ও রাস্তা নির্মাণকাজে শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের মালিক জাকাউল্লাহ ছয়জনের নাম উল্লেখ ও আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত রেখে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন।


মানববন্ধনে শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন- মাওলানা আবুল কাশেম, আবুল কালাম, আমিনুল মেম্বার, আক্তার হোসেন, আবু তালেব, সিরাজুল ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, রেজাউলসহ অনেকেই। গ্রামবাসী জানায়, গত রোববার ঠিকাদার ব্রিজের পাশের রাস্তায় কয়েকটি গাইড পিলার স্থাপন করেন। এগুলো নিম্নমানের হওয়ায় প্রতিবাদ করলে কয়েকটি পিলার হাতেই নড়েচড়ে ভেঙে পড়ে। এরপরই তাদের বিরুদ্ধে থানায় ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগ দায়ের করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এমনকি ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে স্থানীয়দের হয়রানি ও এক যুবককে মারধর করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।


গ্রামবাসী জানান, ‘শুরু থেকেই ব্রিজের কাজে অনিয়ম হয়ে আসছে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার থাকায় প্রতিবাদ করলে হামলা-মামলার হুমকি দেয়া হতো। এখনও প্রতিবাদ করায় মামলা হচ্ছে। আমরা এর প্রতিকার চাই। এখানে কাজ একেবারে নিম্নমানের হচ্ছে। হাত দিলেই সিমেন্টের ঢালাই ভেঙে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই চাঁদাবাজির মামলা দেয়া হচ্ছে।’


বালিহুদা গ্রামের আলমগীর হাসান বলেন, ‘নদীর পাড়ে আমাদের নিজস্ব জমিতে বসতবাড়ি। যখন ব্রিজের সম্ভাব্যতা যাচাই করে, তখন আমাদের বাড়ি বরাবর ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা করে। আমাদের বাড়ি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনাও হয়। এরপর আমরা ১০ শতক জমি দান করি। যার কোনো ক্ষতিপূরণ নিইনি। আমাদের জমি নিয়েছে, কিন্তু ব্রিজটি পরিকল্পনা মাফিক না হওয়ায় সৌন্দর্য্য হারিয়েছে। আমাদের বাড়িটিও ব্রিজে আটকে গেছে।’
মাধবপুর গ্রামের জুয়েল রানা বলেন, ‘আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদের ওপর ব্রিজটি। ভৈরব নদ খনন করে প্রশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নবনির্মিত ব্রিজটি পরিকল্পনা মাফিক না হওয়ায় নদটি ব্রিজের নীচে সরু খালে পরিণত হয়েছে।’


স্থানীয় কৃষক কামাল উদ্দীন বলেন, ‘ব্রিজটির দুই পাশের মুখ একেবারে সরু করা হয়েছে। ব্রিজের দক্ষিণ পাশে নেমেই বড় বড় পুকুর রয়েছে। সেখানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। পুকুরের ধারে গাইড ওয়াল ও ব্লক দেয়ার কথা থাকলেও বাঁশ, কলাগাছ ও মাটি দিয়ে ভরাট হয়েছে। এতে সড়ক ধসে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা বারবার বলা সত্ত্বেও ঠিকাদার তোয়াক্কা করেনি।’ 


স্থানীয় মহিউদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আমার নিজস্ব মালিকানা পুকুরের অর্ধেক দখল করে ব্রিজের গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিবাদ করলে ও ক্ষতিপূরণ চাইলে তারা আমাকে মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে।’
সোহাগ নামের এক যুবক জানান, তিনি তার জমিতে সার দিয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন। এসময় জীবননগর থানার এসআই আসলাম তাকে একটি ভিডিও দেখিয়ে বলেন, যারা পিলার ভেঙ্গেছে এদের চিনিস কি না? কৃষক সোহাগ প্রতিউত্তরে না বললে, এসআই আসলাম তাকে চুল চেপে ধরে মারধর করেন। তবে এসআই আসলাম মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।


এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, প্রোগ্রাম ফর সাপোর্ট রুরাল ব্রিজ (এসইউপিআরবি) প্রকল্পের অধীন সন্তোষপুর আর অ্যান্ড এইচ আন্দুলবাড়ীয়া জিসি হাসাদাহ আর অ্যান্ড এইচ সড়কের ১৪১ দশমিক ২০ মিটার চেইন ৮১ দশমিক ৬০ মিটার দীর্ঘ ব্রিজের ক্যাপাসিটি এক্সপারশনকরণ কাজটি অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব ব্যাংক। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে প্যাকেজ নং সাপআরবি/চুয়া/সিই/২২-২৩/ডব্লিউ -৪১ কাজটি পায়, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জীবননগরের জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স। এ কাজের চুক্তি মূল্য ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৩ টাকা। প্রাক্কলন মূল্য ছিল ৪ কোটি ৫১ লাখ ৬৩ হাজার ১১৪ টাকা। ব্রিজ নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ২০ জুলাই এবং কার্যাদেশ মোতাবেক শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ২০ জুলাই। কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়াদ বাড়ানো হয়।


জীবননগর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম জানান, গ্রামবাসীর অভিযোগ এবং তাদের চাহিদার বিষয়ে তিনি সরেজমিন বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় চলমান ব্রিজের কাজ পরিদর্শন করেন। ব্রিজের দুই পাশে রাস্তা নির্মাণ সংক্রান্ত কাজগুলো তিনি কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সেই সঙ্গে গ্রামবাসীদের চাহিদা মতো ভালোভাবে কাজটি শেষ হবে বলে তিনি দাবি করেন।


ঠিকাদার জাকাউল্লাহ বলেন, ‘এই ব্রিজের কাজটি আমি প্রায় শেষ করে এনেছি। তখন কিছু ব্যক্তি না বুঝে কাজটিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এ জন্য আমি কয়েকজনের বিরুদ্ধে জীবননগর থানায় অভিযোগ করেছি।’
জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামুন হোসেন বিশ্বাস জানান, ঠিকাদার জাকাউল্লাহ থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। এ কারণে থানা থেকে তদন্তের জন্য এসআই আসলামকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম জানান, ঠিকাদার জাকাউল্লাহ ভালো মানের ঠিকাদার। ব্রিজটি কালো পাথর ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে। সংবাদ প্রকাশ করলে বিশ্ব ব্যাংক সকল সুযোগ বন্ধ করে দেবে। ব্রিজ সংক্রান্ত সংবাদ না করার জন্য তিনি অনুরোধ করেন।



কমেন্ট বক্স
notebook

দামুড়হুদায় দীর্ঘ ২৫ বছর পর আদালতের রায়ে পৈত্রিক জমি ফিরে পেল পরিবার