শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

জীবননগরে স্বর্ণ চোরাচালান থেকে অপহরণ, পুলিশের শ্বাসরুদ্ধকার অভিযান

২৩ দিন নির্মম নির্যাতনের পর ৫ জন উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৪
  • আপলোড তারিখঃ ০৬-১১-২০২৫ ইং
জীবননগরে স্বর্ণ চোরাচালান থেকে অপহরণ, পুলিশের শ্বাসরুদ্ধকার অভিযান

চুয়াডাঙ্গার জীবননগের স্বর্ণ চোরালানকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ২৩ দিন ধরে নিখোঁজ থাকা পাঁচ অপহৃত ব্যক্তিকে অবশেষে উদ্ধার করা হয়েছে। এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে গতকাল বুধবার যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানাধীন একটি নির্জন খামারবাড়ি থেকে তাদের উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ। পাঁচজনকেই নির্মম নির্যাতনসহ একজনের হাতের চারটি আঙ্গুল কেটে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে আটক তিনজন ও অপহৃতদের মধ্যে থেকে শফিকুল ইসলাম শফি নামের একজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছি পুলিশ।


গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটায় এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ জানায়, বুধবার সকাল ৭টায় ঝিকরগাছার হাজিরবাগ ইউনিয়নের কুল্লা গ্রামের জনৈক রেজাউল ইসলামের খামারবাড়ি ঘিরে ফেলে পুলিশ। এই খামারবাড়ির গোডাউনেই অপহৃতদের অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছিল। অভিযানের সময় ভিকটিমদের পাহারারত অবস্থায় মো. বিল্লাল হোসেন (৪০) ও তাঁর স্ত্রী মোছা. সাগরিকা খাতুনকে (২৮) গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া অপহৃতদের চিকিৎসা প্রদানকারী গ্রাম্য চিকিৎসক বিকাশ দেবনাথকেও (৩০) পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।


তবে খামারবাড়ির মালিক রেজাউল ইসলাম ও আব্দুল গফ্ফার অভিযানের আগেই পালিয়ে যান। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলার নির্দেশনায় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল আল নাসের ও সহকারী পুলিশ সুপার মো. আনোয়ারুল কবীরের নেতৃত্বে জেলা ডিবি, সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল এবং পুলিশ সুপারের বিশেষ টিমের সমন্বয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়।


উদ্ধারকৃত ভিকটিমদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ নির্যাতনের তথ্য। পুলিশ জানায়, মূলত স্বর্ণ চোরাচালান ও ৫০ পিস স্বর্ণের বার খোয়া যাওয়াকে কেন্দ্র করেই এই অপহরণের ঘটনা। অপহৃতদের অমানসিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়। সবচেয়ে নির্মম বিষয়টি হলো, স্বর্ণ পাচারকারী ও অপহৃতদের মধ্যে একজন শফিকুল ইসলামের চারটি আঙুল কেটে দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণের বার উদ্ধারের জন্যই মালিকপক্ষের নির্দেশে এই নির্যাতন চালানো হয়।


প্রেস ব্রিফিংয়ে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল আল নাসের বলেন, গত অক্টোবর মাসের ১২ ও ১৩ তারিখে গোয়ালপাড়া (মাঠপাড়া) গ্রামের শফিকুল ইসলাম শফি (৩৫), আনারুল ইসলাম (৫০), হাসান মিয়া (২৬), আবুল হোসেন (২৭) এবং স্বপন ইসলামসহ (৪৪) পাঁচজনকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় ভিকটিম হাসান মিয়ার বাবা শওকত আলী বাদী হয়ে আব্দুল মজিদ, মিজানুর রহমান রুবেল, লালন মণ্ডল, আব্দুস সামাদ, বিপ্লব হোসেন, শাহীনসহ অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনের বিরুদ্ধে জীবননগর থানায় অপহরণ মামলা (মামলা নম্বর ০৮, তারিখ ২১ অক্টোবর ২০২৫) দায়ের করেন। এর আগে এই মামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।


স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় , গত ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ থেকে ৫ কেজি স্বর্ণ ভারতে পাচারের জন্য গয়েশপুর মাঠ দিয়ে সীমান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন স্থানীয় আনার হোসেনের ছেলে শফিকুল ইসলাম শফি। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পাচার চক্রেরই সদস্য আবদুল মজিদ, রুবেল ও শাহিন বেনীপুর ক্যাম্প থেকে দুজন বিজিবির সদস্য এনে ধাওয়া দেওয়ার ‘অভিনয়’ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শফি তাঁর কাছে থাকা একটি বস্তা ফেলে পালিয়ে যান। এরপর আবদুল মজিদ কয়েকজনকে সঙ্গে এনে সোনা খোঁজার অভিনয়ও করেন।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেই সোনার মালিক ভারতের চোরকারবারি পঙ্কজ ও চৈতন্য নামের দুই ব্যক্তি। ঘটনার দিন স্বপন, আবুল হোসেন ও হাসান ওই এলাকায় মাঠে ঘাস কাটছিলেন। আর আনার হোসেন ও তাঁর ছেলে শফি সেই চোরাচালান বহন করছিলেন। সোনার চালান হারিয়ে যাওয়ার পর ভারতের চোরাকারবারিদের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয় সোনা উদ্ধারের জন্য। এরপর গত ১৩ অক্টোবর স্বপন, আবুল হোসেন ও হাসানকে তুলে নিয়ে যান চোরাকারবারি চক্রের সদস্য আবদুল মজিদ, লালন, রুবেলসহ কয়েকজন। এরপর থেকে তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।


এদিকে, চোরাকারবারি চক্রের সদস্য আনার হোসেন ও তাঁর ছেলে শফিও পরদিন অর্থাৎ ১৪ অক্টোবর নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় ৩ নভেম্বর গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর নড়েচড়ে বসে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গত মঙ্গলবার জীবননগরের হরিহরনগর গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল হক (৪৫) ও আমিরুল ইসলামকে (৩৭) আটক করে পুলিশ। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ।
তবে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনা সংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি জেলা পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল আল নাসের বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য বলা সম্ভব হচ্ছে না। এই মামলার মূল আসামিরা এখনও পলাতক। উদ্ধারকৃত ভিকটিমদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। এই অপহরণ ও নৃশংস নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। আপনারা অচিরেই বিস্তারিত জানতে পারবেন।’



কমেন্ট বক্স
notebook

চুয়াডাঙ্গায় বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় প্রার্থনা অনুষ্ঠানে শরীফুজ্জামান