ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা একটায় চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় খুলনা রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন এ তথ্য জানান।
সভায় বেলায়েত হোসেন জানান, নির্বাচন ঘিরে পুলিশ যাতে কোনো পক্ষের হয়ে কাজ না করে, সে লক্ষ্যে সারাদেশের মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর এবং বিভিন্ন স্তরের প্রায় দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে তিনটি ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, আগের বিতর্কের ছাপ মুছে গিয়ে এবার পুলিশ সত্যিকার অর্থেই নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করুক।’
খুলনা রেঞ্জের এ শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন ঘিরে সারাদেশে গঠিত ১০০টি পুলিশ টিমের সদস্যরা এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন। প্রশিক্ষণে আইনি জ্ঞান, ভোটের দিন দায়িত্ব পালনের কৌশল, গুজব মোকাবিলায় গোয়েন্দা তৎপরতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অস্ত্র ও বডিঅর্ন ক্যামেরা ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শুরু হয় ৫ অক্টোবর। এতে কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার সদস্যরা অংশ নিচ্ছেন। তিন দিনের এই প্রশিক্ষণ মডিউলের প্রথম দিনে নীতিগত জ্ঞান ও নির্বাচনী আইন কাঠামো, দ্বিতীয় দিনে ব্যবহারিক প্রস্তুতি, কৌশল ও মাঠ পর্যায়ের অনুশীলন এবং তৃতীয় দিনে অস্ত্র ও বডিঅর্ন ক্যামেরা ব্যবহারে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ।
এছাড়া প্রতিটি ভেন্যুতে বডিঅর্ন ক্যামেরার ব্যবহার শেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে মক ভোট কেন্দ্র পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, মিডিয়া ব্যবস্থাপনা ও গুজব প্রতিরোধে পুলিশের করণীয় বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকাকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা ওঠে, ক্ষমতার অপব্যবহার, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং রাতের আঁধারে দিনের ভোট দেওয়ার মতো অভিযোগে কলঙ্কিত হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এবার সে ইতিহাস পেছনে ফেলে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই বড় পরিসরে এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
মাঠ পুলিশকে নির্বাচন পূর্ব, নির্বাচনকালীন ও পরবর্তী সময়ের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে- ভোটকেন্দ্রে ফোর্স মোতায়েন কৌশল, ভোটের দিন স্ট্রাইকিং ও মোবাইল ফোর্সের কর্মবণ্টন, বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা মোকাবিলা, জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা সহায়তা সেবা দেওয়া, নির্বাচনোত্তর সহিংসতা প্রতিরোধ, মাস্টার ট্রেইনারদের নেতৃত্বে মাঠ প্রশিক্ষণ।
এর আগে ইন্সপেক্টর থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যন্ত কর্মকর্তাদের ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারাই এখন মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাদের মূল লক্ষ্য, নির্বাচনকালে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, আচরণবিধি মেনে চলা এবং আইন অনুযায়ী পেশাদার ভূমিকা রাখা। ‘থাকবে পুলিশ জনপদে, ভোট দিবেন নিরাপদে’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেন বেলায়েত হোসেন।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার খন্দকার গোলাম মওলা, দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক ও বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি চুয়াডাঙ্গা জেলা ইউনিটের সাবেক সভাপতি নাজমুল হক স্বপন, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি রাজিব হাসান কচি, সাধারণ সম্পাদক বিপুল আশরাফসহ জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক