আওয়াল হোসেন, দর্শনা:
দামুড়হুদা উপজেলায় প্রকৃতি জানিয়ে দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আর সেই সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন খেজুর রস সংগ্রহে নিয়োজিত গাছিরা। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে হাউলী ইউনিয়নের বড় দুধপাতিলা কাতলামারী মাঠে গিয়ে দেখা যায়, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত গাছিরা। শীতের আগমনী বার্তা পেয়ে বড় দুধপাতিলা গ্রামের বাদল মণ্ডলের ছেলে রনি মিয়া ওরফে মোজাসহ একাধিক ব্যক্তি মিঠা রস ও গুড় সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃত জবেদ আলীর ছেলে বাদল মণ্ডল, বাহার আলীর ছেলে বুদো মিয়া, বাদল মণ্ডলের ছেলে মোজা এবং মনিরুল ইসলাম।
রনি মিয়া বলেন, ‘চলতি মৌসুমে খেজুর রস সংগ্রহের জন্য আমি ২০০টি গাছ প্রস্তুত করছি। এর মধ্যে ৯৭টি গাছ প্রস্তুত হয়ে গেছে, বাকি গাছগুলোর প্রস্তুতি চলছে। প্রতি বছর আমি ২০০টি গাছ কাটি এবং প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ কেজি খেজুর গুড় উৎপাদন করি। এগুলো আমরা জয়রামপুর হাটে বিক্রি করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি গুড় ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। শেষদিকে দাম নেমে আসে ১৩০ টাকায়। আমি ৭ বছর বয়স থেকে বাবার সঙ্গে খেজুর গাছ কাটা শিখেছি। প্রতি বছর আশ্বিন মাসের ২০ তারিখ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু করি এবং কার্তিক মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে গুড় উৎপাদন শুরু হয়। এই কাজ চলে চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। মৌসুম শেষে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়, যা দিয়ে সারা বছরের চাষাবাদের খরচ চলে।’
তিনি বলেন, ‘গুড় জ্বালানোর জন্য বাড়তি কোনো খরচ করতে হয় না। খেজুর গাছের ডাল ও পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। এ বছর আমার ছোট ভাই মনিরুল ইসলাম ২০০টি গাছ, চাচাতো ভাই ১৫০টি, আমি নিজে ২০০টি ও আমার বাবা ১৭০টি খেজুর গাছ প্রস্তুত করেছি। আমাদের পরিবারে দাদা জবেদ আলী থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর থেকে আমরা খেজুর রস ও গুড় উৎপাদন করে আসছি।’
দর্শনার আকুন্দবাড়ীয়া গ্রামের সামছুদ্দিনের ছেলে ৬০ বছর বয়সী গাছী আব্দুল হান্নান। তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৭৩ সাল থেকে খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করে আসছি। এ বছর ৮০টি গাছ প্রস্তুত করেছি। এক সপ্তাহ পর থেকে প্রতিদিন ৭-৮ কেজি করে গুড় উৎপাদন হবে। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত এ রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদন চলবে। এক মাস পর প্রতিদিন ২ থেকে ৩ ভাড় করে গুড় উৎপাদন হবে।’
পরানপুর গ্রামের কায়েম আলীর ছেলে হবি জানান, ‘এ বছর আমি ৫৬টি খেজুর গাছ প্রস্তুত করেছি। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন ২ কেজি করে পাটালি গুড় তৈরি করছি, যা ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি।’ একই গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে মতিয়ার রহমান জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ৭৫টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করছেন।’
জানা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলায় বর্তমানে ২৭টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি ভাটায় খেজুর গাছ ও অন্যান্য গাছের খড়ি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাকি ১৫টি ভাটায় কয়লা ও কিছু কিছু খড়ি ব্যবহৃত হয়। যে কারণে প্রতি বছরই গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমীন আক্তার জানান, ‘উপজেলায় প্রায় ২৫ হেক্টর জমিতে ৬০ হাজার ২৫০টি খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে বছরে ১৪০ থেকে ১৫০ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদিত হয়। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক চাষাবাদের কারণে খেজুর গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে গাছে উঠে রস সংগ্রহে ঝুঁকি থাকায় কৃষকরা অনেক সময় গাছ কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দেন। প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ হাজার খেজুর গাছ ইটভাটায় বিক্রি হয়ে যায়।’ এদিকে, উপজেলার সবচেয়ে বড় খেজুর গুড়ের হাট বসে জয়রামপুর রেলস্টেশনের পাশে। এখান থেকে প্রতি হাটে ৪ থেকে ৫ টন গুড় পাইকারদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়। উপজেলা থেকে উৎপাদিত বেশিরভাগ খেজুর গুড় বিক্রি হয় এই হাটেই।
দর্শনা অফিস