চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় ভুল অস্ত্রোপচারে ও চিকিৎসা অবহেলায় নুপুর আক্তার (২২) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছে পরিবার। শুক্রবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় শঙ্কাজনক অবস্থায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ আলমডাঙ্গার ‘পপুলার মেডিকেল হাসপাতাল’ এ ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে নুপুরের সিজার করা হয়। সিজারের কয়েক ঘণ্টার পর মৃত্যুর মুখে পতিত হলে নুপুরকে উন্নত চিকিৎসার নামে রেফার্ড করা হয়। নিহত নুপুর উপজেলার কালিদাসপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের শরিফুল ইসলামের মেয়ে ও মুন্সিগঞ্জ এলাকার অটোরিকশাচালক আমিন উদ্দীনের স্ত্রী।
এদিকে, প্রসূতি নুপুরের স্বজনরা জানান অপারেশনের পূর্বে চারব্যাগ রক্ত জোগাড় করতে বলা হয়েছিলো তাদের। চারব্যাগের ব্যবস্থা না করতে পারলেও একব্যাগ রক্ত নুপুরের শরীরে দেয়া হয়। তবে, অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক বলছেন ভিন্ন কথা। নুপুরের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারী চিকিৎসক হারদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. নানজীন সুলতানা দাবি করেন, অস্ত্রোপচারে অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। রোগীর শরীরে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হয়নি।
জানা গেছে, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় নুপুরকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য শুক্রবার সকালে ওই ক্লিনিকে নেয় পরিবারের সদস্যরা। ক্লিনিকে পৌঁছানোর এক ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় নুপুরকে। বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হলে অপারেশন থিয়েটার থেকে নুপুর ও তার নবজাতক সন্তানকে ওয়ার্ডে নেয়া হয়। কিস্তু অপারেশনের পর নুপুরের শরীরে একব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। কিন্তু দুপুর থেকে নুপুরের অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যায় তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেলে রেফার্ড করা হয়। কিন্তু কুষ্টিয়া হাসপাতালে নেয়ার পথেই নুপুরের মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসকদের উপস্থিতি ছাড়াই নার্স বা অদক্ষ কর্মচারীদের দিয়ে রোগীর অস্ত্রোপচার করানোর ঘটনা ‘পপুলার মেডিকেল হাসপাতাল’-এ নতুন নয়। এর আগেও এমন ঘটনা এই ক্লিনিকে ঘটেছে। নুপুরের স্বজনেরা অভিযোগ করেন, ‘নুপুরকে ক্লিনিকে নেয়ার সময় চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না, নার্সদের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল।’
নুপুরের স্বামী আমিন উদ্দীন অভিযোগ করেন, ‘যে চিকিৎসকের সিজার করার কথা ছিলো পপুলার ক্লিনিকে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। ক্লিনিকে পৌঁছানোর ১ ঘণ্টার বেশি সময় পরে নুপুরকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। কোন চিকিৎসক অপারেশন করেছে তাও জানানো হয়নি। শেষ সময় আমার স্ত্রীকে রেফার্ড করা হয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে আমার স্ত্রীকে মরতে হতো না। এখন আমার তিনটি বাচ্চাকে নিয়ে আমি অকুর পাথারে পড়লাম।’
নিহত প্রসূতির চাচা আব্দুল মালেক বলেন, ‘রক্ত ম্যানেজ ছিলো, একব্যাগ দেয়া হয়েছিলো তার শরীরে। দুপুর পর্যস্ত নুপুর ভালো ছিলো, কিন্তু দুপুরের পর থেকে তার অবস্থা খারাপ হতে থাকে। সন্ধ্যায় অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে কুষ্টিয়া পাঠানো হয়। কুষ্টিয়া পৌঁছানোর পূর্বে তার মৃত্যু হয়।’
ডা. নানজীন সুলতানা বলেন, ‘প্রসূতি নুপুরের তৃতীয় সিজার ছিলো এটি। তার অবস্থা স্বাভাবিক থাকায় সিজার করা হয়। সিজারের আগে ও পরে কোনো সমস্যা হয়নি। অ্যানেসথেসিয়া দেন কুষ্টিয়ার একজন চিকিৎসক। দুপুর পর্যন্ত সবকিছু ঠিত ছিলো, কিন্তু দুপুরের পর থেকে প্রসূতির ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায় ও পাল্স রেট কমতে থাকে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।’
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শারমিন আক্তার বলেন, ‘পত্রিকা মাধ্যমে জানার পর আমি স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তাদের বাড়িয়ে পাঠিয়েছিলাম। নিহত প্রসূতির মা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল ১০টায় পপুলারে ভর্তির পর বেলা ১১টায় নুপুরের অপারেশন করা হয়। এসময় বা পরবর্তীতে রোগীর শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হয়নি। তবে, রোগীর পাল্স পাওয়া যাচ্ছিলো না। প্রসূতির মা আরও জানিয়েছেন, ডা. নাজনীন সুলতানা অপারেশন করলেও কোনো অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক ছিলো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনা সম্পর্কে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. আওলিয়ার রহমানকে জানানো হয়েছে। তিনি প্রসিডিউর অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।’
চুয়াডাঙ্গা ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. আওলিয়ার রহমান বলেন, ‘আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ঘটনাটি সম্পর্কে আমাকে জানিয়েছেন। আমি নিয়মিত সিভিল সার্জনকে জানিয়েছি। তিনি ওমরাহর জন্য গেছেন। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো।’
এদিকে, আজ শনিবার সকালে পাইকপাড়া গ্রাম্য কবরস্থানে তার লাশের দাফন কার্য সম্পন্ন করে পরিবার।
নিজস্ব প্রতিবেদক