কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সুন্দর আগামী কামনা ও ভক্ত-বিশ্বাসীদের অশ্রুসজল চোখে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে চুয়াডাঙ্গায় শেষ হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসব। গতকাল বৃহস্পতিবার উৎসবের শেষ দিনে ভক্তরা মণ্ডপে মণ্ডপে উপস্থিত হয়ে সিঁদুর খেলা, দর্পণ বিসর্জন, পুষ্পাঞ্জলি ও শোভাযাত্রায় অংশ নেন। দিনভর আনন্দ উল্লাসের পর বেজে ওঠে বিষাদের সুর। কেননা টানা পাঁচ দিন পর বাবার বাড়ি থেকে দেবী দুর্গাকে দেবালয়ের কৈলাসে স্বামীর বাড়িতে বিদায় নেয় দেবী দুর্গা।
চুয়াডাঙ্গা:
চুয়াডাঙ্গায় উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। গতকাল বিজয়া দশমীতে সমাপ্তি ঘটেছে পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবের। ঢাকের বাদ্য এবং কাঁসর ধ্বনিতে পুরো শহর যেন উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে। বিগত বছরের ন্যায় এবারেও বিসর্জন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কঠোর নজরদারিতে ছিল মন্দির ও বিসর্জনের ঘাটগুলো। ফলে জেলার কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়ায় নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় এই শারদীয় দুর্গোৎসব।
শহরতলীর দৌলাতদিয়ার দক্ষিণপাড়া বারোয়ারী দুর্গা মন্দির, বড় বাজার দুর্গা মন্দিরসহ অন্যান্য মন্দির থেকে প্রতিমাগুলো শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মাথাভাঙ্গা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নেন পূজা কমিটি এবং রাজনৈতিক দলসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা, যাতে হাজারো মানুষ অংশগ্রহণ করে।
বড় বাজার শ্রী শ্রী সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে দেখা যায়, নারী-পুরুষ সকলে ঢাক ও কাঁসরের শব্দে নেচে-গেয়ে আনন্দে শহর প্রদক্ষিণ শেষে মাথাভাঙ্গা ব্রিজের নিচে একত্রিত হয় এবং সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা ব্রিজ ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নারী-পুরুষ সকলে নেচে-গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। চুয়াডাঙ্গা জেলায় এ বছর মোট ১১২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবং প্রতিটি মণ্ডপে পূজার আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে।
বড় বাজার শ্রী শ্রী সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের সাধারণ সম্পাদক কিংকর কুমার দে বলেন, ‘মায়ের কাছে প্রার্থনা, সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যেন আমরা সকলে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারি। পূজা উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপন করতে পেরে আমরা আনন্দিত।’ তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং জেলা বিএনপির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এদিকে, জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ শারদীয় দুর্গোৎসবের শুরু থেকে বিসর্জন পর্যন্ত বিভিন্ন মন্দির পরিদর্শন করেন এবং দলের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে জেলার সবগুলো মন্দিরের নিরাপত্তায় গুরুত্ব ভূমিকা পালন করেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চুয়াডাঙ্গায় শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপিত হওয়ায় সবার মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে।
গতকাল বিজয়া দশমীর দিন চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদীতে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে ৫ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে পূজা-অর্চনা এবং সিঁদুর খেলার মধ্যদিয়ে ভক্তরা দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান। বিকেল ৪টা থেকে প্রতিমাগুলো নিজ নিজ মণ্ডপ থেকে নদীতে এনে নৌকায় তোলা হয়। ঢাক-ঢোল, কাঁসা এবং মাইকের গানে নদীর দুই পাড় মুখরিত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে এ নয়নাভিরাম দৃশ্য অবলোকন করেন। সন্ধ্যার দিকে নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়, যেখানে শোভাযাত্রার মাধ্যমে দেবীকে নাচ-গানের মাধ্যমে হাসিমুখে বিদায় জানানো হয়।
দেবী দুর্গার বিসর্জনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন সার্বিক মনিটরিং করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলের পাশাপাশি ডিবি পুলিশ ও সাদা পোশাকের সদস্যরা মোতায়েন ছিল সর্বত্র। সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। দুর্গোৎসবের শুরু থেকে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা নিশ্চিত করেছে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ।
সরোজগঞ্জ:
চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জে বিজয়া দশমীতে গতকাল দুপুরের পর থেকে শুরু হয় দেবী দুর্গার দর্পণ বিসর্জন ও পুষ্পাঞ্জলি প্রদান। ভক্তরা দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বিদায় জানান এবং মায়ের চরণ থেকে আশীর্বাদ নেন। শাস্ত্র মতে, বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গা দোলায় চড়ে কৈলাসে ফিরে যান। সেই অনুযায়ী, দেবী বিদায়ের আগে সিঁদুর খেলা ও আরাধনায় অংশ নেন ভক্তরা। উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয় পূজামণ্ডপ। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সরোজগঞ্জের কাছারিপাড়া পূজামণ্ডপের প্রতিমা নবচিত্র নদীতে এবং বোয়ালিয়ার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় নবগঙ্গা নদীতে। হাজারো ভক্তের অংশগ্রহণে উৎসবটি পরিপূর্ণতা পায়।
দামুড়হুদা:
দামুড়হুদা উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও দর্শনা পৌরসভা মিলিয়ে মোট ২১টি পূজামণ্ডপে এ বছর দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব শেষ হয়। প্রতিটি মণ্ডপে আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল ও সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। দিনভর ভক্তরা পূজায় অংশ নেন, অঞ্জলি দেন ও মন্ত্রপাঠে মিলিত হন। পূজার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ। দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবির জানান, ‘প্রতিমা তৈরির পর থেকেই আমরা নজরদারিতে রেখেছিলাম। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। এবার ১৩টি প্রতিমা শান্তিপূর্ণভাবে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।’ হাউলি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে পূজা উদযাপন করেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’ হাউলি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, ‘এবার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পূজা উদ্যাপন করেছেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে।’
দর্শনা:
দর্শনায় বিজয়া দশমীতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে শেষ হয় দুর্গাপূজা। সকাল থেকেই বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জন অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে শুরু হয় শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জন। মাথাভাঙ্গা নদীতে ৬টি মণ্ডপ-দর্শনা হরিজন, পুরাতন বাজার, কেরুজ, রামনগর দাসপাড়া, আদিবাসীপাড়া ও পারকৃষ্ণপুর পূজামণ্ডপ-বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যদিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেয়। এর আগে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন নারী ভক্তরা। দেবীকে সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে নিজেদের মঙ্গল কামনা করেন তারা। ঢাকের তালে তালে বিদায় জানানো হয় মা দুর্গাকে।
জীবননগর:
জীবননগর উপজেলায় এবারের দুর্গোৎসবে ২২টি পূজামণ্ডপে ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়েছে মহা উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে। উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই উৎসব শেষ হয়েছে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ন্যায়-অন্যায়ের চিরন্তন দ্বন্দ্বে দেবী দুর্গার আবির্ভাব এবং মানবিকতার জয়গান উদ্যাপন করে বিসর্জনের মাধ্যমে দেবীর বিদায় জানায় ভক্তরা। দুর্গোৎসব উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু।
সমীকরণ প্রতিবেদন