সোহেল রানা ডালিম:
চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণকেন্দ্র রেলবাজার এলাকায় রেলওয়ে ওভারপাস নির্মাণ প্রকল্পে ভর করেছে অনিশ্চয়তা। এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই বছর পার হলেও শেষ হয়নি প্রকল্পটি। বরং ধীরগতিতে চলা এ কাজ নানা জটিলতায় আরও পিছিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৬০ শতাংশ। রাস্তা পারাপারের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় নির্মাণাধীন এ ওভারব্রিজ নিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ একাডেমি মোড় ও সাতগাড়ি মোড় এলাকায় দেখা দিয়েছে ব্যাপক অসন্তোষ ও উদ্বেগ।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিকল্পনাহীনভাবে কাজ শুরু হওয়ায় যাত্রী ও পথচারীদের ভোগান্তি সমাধানের বদলে আরও বেড়ে যাবে।
চুয়াডাঙ্গা সড়ক ও জনপদ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, ৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ওভারপাসের দৈর্ঘ্য ৪১৮.৬৯৬ মিটার। র্যাম্পের দৈর্ঘ্য ৩৩০ মিটারসহ মোট দৈর্ঘ্য ৭৪৮.৬৯৬ মিটার। প্রস্থ ১০.২৫০ মিটার, ক্যারিয়েজওয়ে ৭.৩০ মিটার, হেডরুম ৮.৫০ মিটার। রয়েছে ১২টি পিলার ও ২টি এবার্টমেন্ট। প্রথম নকশায় র্যাম্পের দৈর্ঘ্য ৩৩০ মিটার ধরা হয়েছিল। এতে সংযোগ সড়ক খাড়া হয়ে যাচ্ছিল। এ জন্য নতুন করে সংশোধিত নকশা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংশোধিত নকশায় র্যাম্পের দৈর্ঘ্য আরও ১০২ মিটার বেড়ে যায়। ফলে ওভারপাসের মোট দৈর্ঘ্য একাডেমি মোড় ও সাতগাড়ি মোড় ছাড়িয়ে যায়। এতে গুরুত্বপূর্ণ দুই মোড়ের সড়ক কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। যান চলাচল শুরু হলে দুই পাশ সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে। এতে দুই পাশের মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাবে।
ওভারব্রিজের কাজ গিয়ে থেমেছে একাডেমি মোড় ও সাতগাড়ি মোড়ের ওপর। কিন্তু রাখা হয়নি কোনো ক্রসিং ব্যবস্থা। ফলে সাতগাড়ির দিক কিংবা আলমডাঙ্গাগামীদের সামনের সড়ক পার হয়ে যেতে হবে অথবা আধা কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হতে পারাপারের জন্য। এতে ওভারব্রিজ দিয়ে চলাচল করা গাড়িগুলো যেমন বাধার মুখে পড়বে, তেমনি ব্রিজের মুখে যানজট সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তি বাড়াবে।
ওভারব্রিজ নির্মাণের মূল লক্ষ্য ছিল যানজট নিরসন ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তর সঠিকভাবে ক্রসিংয়ের পরিকল্পনা না করায় পুরো প্রকল্প প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। একাডেমি মোড় ও সাতগাড়ি মোড়ে যাত্রী উঠানামা, শিক্ষার্থীদের সড়ক পারাপার এবং বাজারমুখী মানুষের চলাচল এখন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এলাকাবাসী জানায়, শহরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সঠিক ক্রসিং না থাকলে প্রতিদিনই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকবে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ও সাধারণ পথচারীরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হবেন। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যানজট নিরসনের নামে যদি মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো হয়, তাহলে এ প্রকল্পের সুফল মিলবে কীভাবে? পরিকল্পনা ছাড়া কাজ শুরু করায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কেবল বাড়ছেই।’
একাডেমি মোড় এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দোকানের সামনে ক্রসিং না থাকায় এখন প্রতিদিনই পথচারীরা বিপাকে পড়ছেন। আগে যেখানে সরাসরি একাডেমি মোড়ে চারমুখীভাবে চলাচল করা যেত, এখন তা দ্বিমুখী হয়ে গেছে। শুধু এই না, ওভারব্রিজের জন্য এখন মানুষকে অনেক পথ ঘুরতে হচ্ছে। ব্রিজ হলো, কিন্তু স্থানীয়দের যাতায়াতে সুফলের পরিবর্তে ঝামেলা বাড়তে চলেছে।’
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা রুবিনা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্কুলগামী ছেলে-মেয়েরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। ওভারপাসটি চালু হওয়ার পূর্বেই এমন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, এইভাবেই ত্রুটি রেখে ওভারপাস চালু হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে সময় লাগবে না।’
রবিউল ইসলাম নামের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, ‘ওভারপাস চালু হলেও আমাদের চলাচলে সুবিধা হবে না। বরং একাডেমি ও সাতগাড়ির প্রবেশ মোড়ে ক্রসিং না থাকায় যাত্রী ও সাধারণ পথচারীরে পারাপারে সমস্যা হবে। যে ওভারপাসটি যানজট কমানোর জন্য তৈরি করা হলো, রেল গেইটে যানজট কমলেও ক্রসিং না থাকায় ব্রিজের মুখেই জ্যাম সৃষ্টির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। পরিকল্পনা ঠিক না থাকলে মানুষ কষ্টই বাড়বে।’
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এটি একটি চলমান প্রকল্প। এখনো কাজ শেষ হয়নি। আমি সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গায় দায়িত্ব পেয়েছি এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ইতোমধ্যে দুই দফা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। প্রকল্পটি যেহেতু শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, তাই আমরা চাই এটি যেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় এবং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি না বেড়ে বরং কমে যায়।’
একাডেমি মোড় ও সাতগাড়ি মোড়ের প্রবেশমুখ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছি। বিষয়টি সমাধানে করণীয় বিষয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নিয়ে অসুবিধাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো, এটি এমনভাবে সম্পন্ন করা- যাতে যানজট নিরসনের পাশাপাশি নিরাপদ যাতায়াতও নিশ্চিত হয়। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান এবং পুরো ওভারপাস নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্পের বর্তমান নকশায় পরিবর্তন এনে একাডেমি মোড় ও সাতগাড়ি মোড়ে সঠিক ক্রসিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় চুয়াডাঙ্গা শহরের মানুষের জন্য এই ওভারব্রিজ ‘জনদুর্ভোগের স্থাপনা’তে পরিণত হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক