চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেছেন, চুয়াডাঙ্গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি সন্তোষজনক থাকলেও অপমৃত্যুর হার বেড়েছে। জুলাই মাসে অপমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১টিতে। এর আগের মাসে অনেকটা কম ছিল। এসব অপমৃত্যুর প্রধান কারণ দেখা গেছে পারিবারিক। এছাড়া চুয়াডাঙ্গার প্রধান প্রধান সড়কগুলো অতিবৃষ্টির কারণে খানাখন্দ হয়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। এগুলো যদি দ্রুত মেরামত করা যায়, তাহলে রাস্তায় চলাচলে উপযোগী হবে। তা না হলে দিন দিন এটি আরও নষ্ট হয়ে যাবে। এ জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান।
গতকাল রোববার সকাল ১০টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা ও অন্যান্য কমিটির সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। তবে সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বলেন, ‘সামনে নির্বাচন আবহ আসছে। সেক্ষেত্রে সংঘাত বাড়তে পারে। সে জন্য সবরকম প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’
এ বক্তব্য দেয়ার পরপরই পাবলিক প্রসিকিউটর মারুফ সরোয়ার বাবু ও আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাঈদ মোহাম্মদ শামীম রেজা ডালিম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘আপনি কী করে জানলেন আগামী নির্বাচনে সংঘাত বাড়তে পারে। আপনি ওই চেয়ারে বসে এ ধরণের কথা বলতে পারেন না।’ সভায় আরও জানানো হয়, এসব রাস্তায় একদিকে ঠিক করা হয়, অপরদিকে সেগুলো উঠে যায়। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রাস্তার বেজ ঠিক থাকলে কার্পেটিং করার সময় ভারি যানবাহন চলায় সেগুলো উঠে যায়। যে কারণে বিভিন্ন রাস্তায় এ সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া ১০ টনের ক্ষমতাসম্পন্ন রাস্তায় বেশিরভাগ সময় ২০ টন লোড নিয়ে যানবাহন চলাচল করে থাকে। এ কারণেও রাস্তার বিভিন্ন ধরণের ক্ষতিসাধন হয়ে থাকে। সড়ক বিভাগের চাহিদামতো বরাদ্দ নেই, তবুও যেটুকু বরাদ্দ আছে, তা দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার গোলাম মওলা বলেন, ‘জেলা প্রশাসক মহোদয় জীবননগরে কয়েকটি ধর্ষণ মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে বলেছিলেন। সেখানে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম বেশিরভাই প্রেমঘটিত। পূর্বে সম্পর্ক ছিল, বিয়ে না করায় অনেক সময় ফাঁসানোর জন্য ধর্ষণ মামলা দিয়ে থাকে। তবে মামলা হলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের পুলিশ আটক করে আদালতে সোপর্দ করেছে। চুরির ঘটনা ইদানিং বেড়েছে। এসব চুরি রোধে পুলিশ কাজ করছে। এছাড়া বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার মোড়ে মোড়ে উঠতি বয়সের যুবকদের অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দেয়ার বিষয়টি উদ্বেকজনক। আমি নিজেও বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখেছি, সেখানে যুবকদের সাথে বড়দেরও আড্ডা বেশি চলে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছি- এখানে এতরাত পর্যন্ত আড্ডা কেন? অনেকেই জানিয়েছেন, সারাদিন কাজ সেরে এখানে কিছুটা সময় কাটায়। আমার প্রশ্ন তারা বাড়িতে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খোঁজখবর, সাংসারিক খোঁজখবর এগুলো বাদ দিয়ে কেন এখানে বাজে সময় কাটায়। আসলে সমাজের সকলে মিলে যদি উদ্যোগ না নেয়া যায়, তাহলে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এগুলো নির্মুল সম্ভব না। পুলিশের সদিচ্ছা আছে, আপানারা সমস্যা নিয়ে আমাকে বলবেন, সে বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে লোকবলের ঘাটতি রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের ৩য় সপ্তাহের মধ্যেই সরকারি বার্তা অনুযায়ী আশা করি ডাক্তার পেয়ে যাবো। এর ফলে উপজেলাগুলোতে যে সঙ্কট, সেগুলো অচিরেই সমাধান হবে বলে আশা করি। এছাড়া সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে এনেসথেসিয়া ডাক্তার নেই। আমরা বহু চেষ্টা করেও এটির সমাধান করতে পারিনি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বারবার তাগিদ দেয়া সত্বেও কোনো ফল পায়নি। আমি কয়েকদিন আগেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছেন, ফাইল রেডি আছে অর্ডার পেলেই ডাক্তার দেয়া হবে। কী কারণে দেরি হচ্ছে, সেটা জানা সম্ভব হয়নি।
আমরা তাদের জানিয়েছে, একটা সদর হাসপাতালে কীভাবে ৬ মাস ধরে এনেসথেসিয়া ডাক্তার ছাড়া চলতে পারে। তারপরও আমরা ফলপ্রসু কিছু পাইনি। গত সোমবার আমাদের নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্স ছিল, সেখানে মহাপরিচালক বলেছিলেন কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে জানানোর জন্য। আমরা সাথে সাথে ঘাটতির ব্যাপারে তাদেরকে জানিয়েছি। আমাদের দিক থেকে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি, বাকিটা অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। এছাড়া টাইফয়েড ভ্যাক্সিনের ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন হবে। যেটি সেপ্টেম্বরের পহেলা তারিখ থেকে শুরু হওয়ার কথা। সেই হিসেবে আমাদের প্রস্তুতি চলছে। এক্ষেত্রে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী বাচ্চাদের অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করতে হবে ভ্যাক্সইপিআই অ্যাপের মাধ্যমে। এই অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করতে হলে প্রত্যেকের ১৭ ডিজিটের জন্ম নিবন্ধন থাকা লাগবে। এটা মূল চ্যালেঞ্জ। এছাড়া সদর হাসপাতালে এসেনসিয়াল ড্রাগস, যেটি সরকারিভাবে দেয়া হয়, আমাদের বরাদ্দ অনুযায়ী তারা দিতে পারে না। আমাদের চাহিদা থাকে ৩ কোটি টাকার ওষুধ, অথচ সেখানে ১ কোটি টাকারও ওষুধ পাওয়া যায় না।’
সভায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাঈদ মোহাম্মদ শামীম রেজা ডালিম চুয়াডাঙ্গার প্রধান প্রধান সড়কগুলো মেরামতের দাবি জানিয়ে বলেন, কোর্ট জামে মসজিদের সামনে স্পিডব্রেকার, সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোর সামনে বেওয়ারিশ গরু ও কোর্ট এলাকার আশেপাশে পাড়া-মহল্লায় ইদানিং কুকুরের উৎপাত বেড়েছে। এতে স্কুলগামী ছোট ছোট বাচ্চাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মারুফ সরোয়ার বাবু জানান, চুয়াডাঙ্গাতে যে ওভারব্রিজ হচ্ছে, সেখানে রাস্তা মেরামতের অবশ্যই বাজেট আছে। অথচ রাস্তাগুলোতে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন ও মানুষজন চলাফেরা করছে। যে কোনো মুহূর্তে সেখানে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। যেহেতু এটি শহরের প্রধান প্রবেশদ্বার, অথচ এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। রাস্তা ঠিক না করে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ওভারব্রিজের কাজ হচ্ছে, এটা মেনে নেয়া যায় না। তিনি অবলম্বে ওই সড়কের মেরামতের দাবি জানান। সম্প্রতি এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গায় মানববন্ধনের প্রস্তুতি চলছিল। চুয়াডাঙ্গার সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদরা সেটিকে আপাতত বন্ধ রেখে কিছুদিন অপেক্ষার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। যদি রাস্তা মেরামতসহ বিভিন্ন কারণে জনরোষ সৃষ্টি হয়, তাহলে তার দায়িত্ব কে নেবে? তিনি প্রশাসনের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান।
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নয়ন কুমার রাজবংশীর পরিচালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম. সাইফুল্লাহ, আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ মেহেদী ইসলাম, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিথি মিত্র, সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ সুজাত কাজী, র্যাব-১২’র ডিএডি হামিদুর রহমান, আনসার ভিডিপির জেলা কমান্ডান্ট ফারুক ইসলাম, কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) দেবাশীষ কুমার দাস, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির সহকারী পরিচালক হায়দার আলী, জেলা শিক্ষা অফিসের গবেষণা কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন, জেলা দুর্নীতি দমন কমিটির সভাপতি প্রফেসর মো. কামরুজ্জামান, সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সিদ্দিকা সোহেলী রশিদ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বেলাল হোসেন, মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মো. আবুল কালামসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিগণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক