রাজধানীর টঙ্গীতে ম্যানহোলে পড়ে নিখোঁজের ৩৬ ঘণ্টা পর চুয়াডাঙ্গা শহরের বাগানপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফারিয়া তাসনিম জ্যোতির (৩২) লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। গত রোববার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত দফায় দফায় উদ্ধার অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। অবশেষে গতকাল সকাল নয়টার দিকে টঙ্গী এলাকার শালিকচুড়া (টেকপাড়া) বিল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। এদিকে, তার মরদেহ চুয়াডাঙ্গার বাগানপাড়ায় এসে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারি হয়ে ওঠে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো তার দুই শিশু সন্তান আরিয়ান ও আইয়ান।
নিহত জ্যোতি চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার প্রয়াত কমিশনার মুন্সি ওয়ালিউল্লাহ বাবলুর একমাত্র মেয়ে। তিনি ঢাকার মিরপুরে পরিবারসহ বসবাস করতেন এবং ‘মনি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল হেলথ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গতকাল সন্ধ্যায় তার মরদেহ চুয়াডাঙ্গার এসে পৌঁছায়। রাত ১০টায় পুরাতন গোরস্তান জামে মসজিদে মরহুমার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে একই কবরস্থানে তার দাফনকার্য সম্পন্ন করে পরিবার।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত রোববার রাতে চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ সংক্রান্ত আলোচনার জন্য টঙ্গীতে যান জ্যোতি। রাত ৮টার পর থেকেই তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সোয়া ৯টার দিকে টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে একজন নারী পড়ে যান। পরে জানা যায়, ওই নারীই ছিলেন ফারিয়া তাসনিম জ্যোতি।
খবর পেয়ে রাতেই ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান শুরু করে, কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। পরদিন সোমবার সকাল থেকে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। উদ্ধার কাজে অংশ নেয় ফায়ার সার্ভিসের আপৎকালীন কর্মী ও পাঁচজন ডুবুরি। তবে সন্ধ্যায়ও উদ্ধার না হওয়ায় ঘটনাস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেদিনের মতো উদ্ধারকাজ বন্ধ করা হয় এবং গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে আবার উদ্ধার কার শুরু করে ডুবুরিরা। অবশেষে সকাল নয়টার দিকে ওই এলাকার শালিকচুড়া (টেকপাড়া) বিল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। পরে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য তাঁর লাশ টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. শাহিন আলম বলেন, ‘ওই ড্রেনের গভীরতা প্রায় ১০ ফুট। দিনভর বৃষ্টির কারণে ড্রেনটি পানিতে পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তীব্র স্রোত ছিল। যে কারণে উদ্ধার অভিযানে সময় বেশি লেগেছে। সোমবার স্থানীয়দের কারণে রাতে উদ্ধার কাজ শেষ করতে হয়। আজ (গতকাল মঙ্গলবার) সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় আবার অভিযান শুরু করা হয়। এবং সকাল নয়টার দিকে শালিকচুড়া বিল থেকে তার লাশ উদ্ধার হলে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।’
জ্যোতির ভাই আক্তারুজ্জামান শোভন বলেন, ‘গত রোববার আমার বোন নিখোঁজ হয়, প্রায় ৩৬ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর মঙ্গলবার সকালে ফায়ার সার্ভিস তার লাশ উদ্ধার করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুপুরের পরেই আমরা লাশ নিয়ে চুয়াডাঙ্গা উদ্দেশ্যে রওনা হই। পরিবারের সকলের মতামতের ভিত্তিতে এশার নামাজের পর পুরাতন গোরস্থানে তার লাশের দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।’
জ্যোতির বড় ভাইয়ের ছেলে আশিকুজ্জামান নিশাত বলেন, ‘এই যে দুর্ঘটনাটি ঘটল। নিষ্পাপ দুই শিশুকে দেখে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তাঁদেরকে কি বলে সান্তনা দেবো। মানুষের জিবনের মূল্য নেই। ঢাকনা বিহীন ড্রেন জীবন কেঁড়ে নিলো। দুই শিশুর থেকে তাদের মাকে ছিনিয়ে নিলো।’
টঙ্গী পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইসকান্দার হাবিবুর রহমান বলেন, হোসেন মার্কেটের পাশে থাকা ম্যানহোলটি ঢাকনাটি কোনো কারণে খোলা ছিল। অসতর্কতা বসত ওই পথচারী ম্যানহোলের মধ্যে পড়ে গিয়ে নিখোঁজ হন। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সকালে তার লাশ উদ্ধার হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ হয়নি, এবং আবেদনের প্রেক্ষিতে লাশ দাফনের জন্য পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’
এদিকে, গতকাল রাত ১০টায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে চুয়াডাঙ্গা পুরাতন গোরস্তান জামে মসজিদে মরহুমার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে একই কবরস্থানে তার দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়। জানাজা ও দাফনে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম পিটু, পৌর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনি, চুয়াডাঙ্গা জেলা দোকান মালিক সমিতির সদস্য সচিব সুমন পারভেজ খান, নিহতের পরিবারের সদস্য, স্বজন, সাংবাদিক, পাড়া-প্রতিবেশীসহ দলমত নির্বিশেষ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক