স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলা আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, গতকাল সোমবার রাত ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর ফলে জেলা শহরের নিচু এলাকাসহ বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাঘাট এবং ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে। শহরের অন্তত ২০টি পরিবার গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। এদিকে, একটানা বৃষ্টিপাতের প্রভাবে ঝিনাইদহে শাক-সবজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সপ্তাহর ব্যবধানে প্রতিটি সবজি কেজি প্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ জামিনুর রহমান জানান, ২৪ ঘণ্টায় চুয়াডাঙ্গায় মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭৮ মিলিমিটার। তিনি বলেন, স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে চুয়াডাঙ্গাসহ আশপাশের জেলায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। দুপুর পর্যন্ত কলকাতার ওপর নিম্নচাপের প্রভাব সক্রিয় ছিল। মৌসুমী বায়ু সক্রিয়তার কারণে আগামী বুধবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যহত থাকতে পারে। তবে আগামী সপ্তাহে সামান্য কমতে পারে।
বৃষ্টির কারণে চুয়াডাঙ্গার শহরতলীর শান্তিপাড়া এবং আশপাশের এলাকার অনেক রাস্তা পানিতে ডুবে আছে। ফলে এ এলাকার মানুষজন সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। অন্তত ২০টি পরিবাররের কর্মজীবী সদস্যরা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য পানি মাড়িয়ে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা হাঁটু পর্যন্ত পানিতে ডুবে চলাচল করছেন।
শান্তিপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘শান্তিপাড়ার এই এলাকাটা নিচু হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষাকালে উচু এলাকার পানি জমে চলাচলের পথসহ কয়েকটি বাড়ির মধ্যেও হাঁটু সমান পানি জমে যায়। অন্য বছরের মতো এবছরও মূল শহরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে থাকায় এই এলাকার ২০টি পরিবারে সদস্যরা গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজন এবং কর্মক্ষেত্রে যাওয়ায় জন্য পরিবারের অভিভাবকদের হাঁটু সমান পানিতে ডুবে চলাচল করতে হচ্ছে।’
শুধু শহরেই নয়, টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে জেলা ও এর বিভিন্ন উপজেলার ফসলি জমিতেও। ধান ও সবজির জমি পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে আমন ধান এবং পেঁপে বাগানে পানি জমে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বর্ষণে জীবননগরের বিভিন্ন মাঠের ফসল ও মাছের পুকুরে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টিতে অনেকের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং ফসলি জমিতে পানি জমে আছে। এতে আমন ধান ও সবজিতে পচন ধরার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
পানি বন্দী হয়েছে জীবননগরের ধোপাখালি, মণ্ডলপাড়ার এবং বেপারী পাড়ার অন্তত ৫০টি পরিবার। এই এলাকার সংযোগ সড়ক দীর্ঘ এক যুগ ধরে সংস্করণ হয়নি রাস্তাটি। এলাকাবাসীদের একটি চাওয়া তাদের এলাকা থেকে যেন পানিটা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। উপজেলার বাঁকা ইউনিয়নের পাথিলা গ্রামের কৃষক সালামত আলী জানান, ভারী বৃষ্টির কারণে তার দুই বিঘা জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানি কমলে ধানের চারা পচে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্ত ইউনিয়নের বেনীপুর গ্রামের কৃষক হায়াত আলী বলেন, তার তিন বিঘা জমিতে মাস কলাই ছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে গেছে এবং কিছু গাছে পচন দেখা দিয়েছে। রোদ না উঠলে এবং যদি আবার বৃষ্টি হয়, তবে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।
ঝিনাইদহ শহরের আরাপপুর, পাগলাকানাই, হামদহ ও উপশহরপাড়ার কাঁচা বাজারগুলোতে মরিচের দাম কেজি প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি। প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে সবজি ও মরিচের ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় শাক-সবজি ও মরিচের দাম বাড়তি বলে জানিয়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কৃষিবিভাগ বলছে, সপ্তাহ ধরে ঝিনাইদহে থেমে থেকে বৃষ্টিপাত অব্যহত রয়েছে। এর প্রভাবে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আবাদকৃত শাক-সবজির মাঠ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি উঠে মরিচের গাছ মারা গেছে। যে কারণে সপ্তাহের ব্যবধানে মরিচের দাম কেজি প্রতি দ্বিগুণ বেড়েছে। গ্রামীণ ও সাপ্তাহিক হাটগুলোতে পাইকারি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি প্রায় ২২০ থেকে ২৩০ টাকা বিক্রি হলেও তবে শহরতলীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকায়।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী বাজারের সবজি ব্যবসায়ী সবুজ হোসেন জানান, সোমবার (২০ জুলাই) পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ২২০ টাকা থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে শহরের বাজারগুলোতে মরিচের দাম কেজিতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেশি নিচ্ছে। এছাড়া বাজারে প্রতি কেজি পটল ২২ থেকে ২৫ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১১০ টাকা, আমড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা, কচু প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, কচুর লতি ২০-২৫ টাকা, পুঁইশাক ২০-২৫ টাকা, বেগুন প্রতি কেজি ৭০-৭৫ টাকা, পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ঝিনাইদহ শহরের সবজি ব্যবসায়ী রমজান আলী জানান, গত সপ্তাহে শাক-সবজির যে দামে বিক্রি হয়েছে, তা চলতি সপ্তাহের শুরুতেই কেজি প্রতি ৫-১০ টাকা বেড়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। উপশহর পাড়ার গৃহবধূ বেবি সুলতানা জানান, সবজির দাম বৃদ্ধির ফলে দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে কাঁচা মরিচ কিনতে হিমশিম খাচ্ছি।
হেনা খাতুন নামে এক ক্রেতা বলেন, ১৫ দিন আগেও কাঁচা মরিচের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে কিনেছিলাম। এখন কেজিতে দুই’শ টাকা দাম বেড়েছে। অন্যান্য সবজির দামও বাড়তি বলে জানান তিনি। ঝিনাইদহ নতুন হাটখোলার সবজির পাইকারি আড়তদার শামসুল ইসলাম বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যে কারণে সবজির উৎপাদন ও বাজারে জোগান কম। ফলে দাম বেড়েছে। তবে গ্রামের বাজারগুলোতে সবজির দাম শহরের বাজারের চেয়ে কিছুটা কম।
কাঁচা মরিচের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর এ নবী বলেন, কাঁচা মরিচের গাছ বৃষ্টির পানিতে মারা যাচ্ছে। উৎপাদন কম হচ্ছে বলে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে যাচ্ছে অন্যান্য সবজির দাম না বৃদ্ধি পায়।
সমীকরণ প্রতিবেদক