* টিআর-কাবিখা প্রকল্পে নেই ভ্যাট-অফিস খরচ, তবুও আদায় জোরপূর্বক
* ইউপি সদস্যদের স্বাক্ষর করিয়ে সব কাজ করছেন চেয়ারম্যান নিজে
* ৯০ লাখ টাকার প্রকল্পে পছন্দের মেম্বারদের বাড়তি বরাদ্দের অভিযোগ
* চিঠি দেখান না, সভা ডাকেন না; ইউনিয়ন চালাচ্ছেন একক সিদ্ধান্তে
* পিআইও বললেন ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’
জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মির্জা হাকিবুর রহমান লিটনের বিরুদ্ধে টিআর/কাবিখা প্রকল্পের কাজ থেকে ২০ শতাংশ করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। টিআর-কাবিখা প্রকল্পে কোনো ভ্যাট বা অফিস খরচ না থাকলেও জোর করে ইউপি সদস্যদের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করেছেন খোদ চেয়ারম্যান নিজে।
জানা গেছে, জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নে টিআর ও কাবিখা বাবদ ৫০ লাখ ২০ হাজার টাকা, উন্নয়ন সহায়তা ১৫ লাখ ৯ হাজার ৬০০ টাকা, বিশেষ বরাদ্দ ১০ লাখ টাকা এবং এডিপি থেকে ৬ লাখ টাকাসহ মোট বরাদ্দ হয়েছে ৮১ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ইউপি চেয়ারম্যান মির্জা হাকিবুর রহমান লিটন অফিস খরচের নাম করে ইউপি সদস্যদের চাপ দিয়ে অর্থ আদায় করেছেন। বিশেষ করে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে ভ্যাট ও আয়করের নামে ২০% টাকা কেটে নিচ্ছেন তিনি।
আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ১৫ বছর আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের মেম্বার। আগেও টিআর কাবিখার কাজ করেছি। অফিস কোনো টাকা নেয়নি। এবারে আমাদের চেয়ারম্যান হাকিবুর রহমান লিটন অফিস খরচের নাম করে প্রত্যেক মেম্বারের কাজ থেকে ২০ শতাংশ করে টাকা নিয়েছেন। এটা সব মেম্বারই জানে। হয়ত কেউ স্বীকার করবে, কেউ করবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘৫ই আগস্টের পর প্রায় ৯০ লাখ টাকার প্রকল্প এসেছে এই ইউনিয়নে। চেয়ারম্যান তার আস্থাভাজন দুই-তিনজন মেম্বারকে বেশি টাকার প্রকল্প দিয়েছে। এবং সেখান থেকেও তিনি মোটা টাকা সরাচ্ছেন। ইট-বালি, সিমেন্ট সব চেয়ারম্যান দিচ্ছে। মেম্বারদের কোনো কাজই করতে দেয়া হচ্ছে না। মানে কাজ হচ্ছে মেম্বারের নামে, আর চেয়ারম্যান নিয়ে নিচ্ছে সব টাকা। মেম্বার শুধু টাকা তুলে চেয়ারম্যানের হাতে দিয়ে আসছে। কোনো কাজের মান ভালো হচ্ছে না।’
মাফিজুর রহমান বলেন, ‘চেয়ারম্যান প্রকল্পের কোনো চিঠি আমাদের দেখান না। আমাদের চেয়ারম্যান হাকিবুর রহমান লিটন আওয়ামী লীগের নেতা। তিনি চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে আমরা কোনো কথায় বলতে পারিনি। কোনো আলোচনা না করেই ইউনিয়নের সব সিদ্ধান্ত তিনি নেন। ইউনিয়নকে তিনি পৈত্রিক সম্পত্তি বানিয়েছেন। ভাতার কার্ড থেকে শুরু করে সব জায়গায় ভুয়া আছে।’
ইউপি সদস্য মো. মিণ্টু মিয়া বলেন, ‘দুই বছর মেম্বার হয়েছি। দুই বছরের মধ্যে পিআইসি কী জিনিস, চোখে দেখিনি। মাস দুয়েক আগে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার কাজ দিয়েছে। এর মধ্যে অফিস খরচের কথা বলে ২৫ হাজার টাকা আগেই নিয়েছে চেয়ারম্যান। এখন এই অফিস খরচটা কোথায় করবেন, সেটা আমি জানি না। সব মেম্বারদের কাছ থেকেই উনি লাখে ২০ হাজার করে টাকা নিয়েছেন।’
নারী ইউপি সদস্য কাজল রেখা বলেন, ‘দুই বছরের মধ্যে এই প্রথম আমাকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার কাজ দেয়। অফিসিয়াল খরচ বলে চেয়ারম্যান আমার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়েছে। তিনি আমার বাড়ি এসে ওই ১৫ হাজার টাকা নিয়ে গেছে।’
ইউপি সদস্য জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ইউনিয়নে কিছু কাজ এসেছিলো। চেয়ারম্যান আমাকে ডেকেছিলো। বলল কিছু কাজ এসেছে, প্রকল্প তোমাদের নামে দেব। কাজ আমি নিজে করব। আমার নামে এক লাখ ২০ হাজার টাকার কাজ দেয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান বললেন, ২৫ হাজার টাকা অফিস খরচ আছে। আমি তিনবারের মেম্বার। আমি জানি, টিআর কাবিখা প্রকল্পে কোনো অফিস খরচ বা ভ্যাট নেই। চেয়ারম্যান বলছে, উপজেলা অফিসে দিতে হবে।’
ইউপি সদস্য মহাসিন আলী বলেন, ‘আমাকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার কাজ দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে ২৫ হাজার টাকা অফিস খরচের নাম করে কেটে নিয়ে নিয়েছে চেয়ারম্যান। এর মধ্যে নাকি আরেকটা কাজে আমাকে পিআইসি করা হয়েছে। কিন্তু কাজটি কোথায় হচ্ছে আমি জানি না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করে দিতে বলেছে, আমি করে দিয়েছি। টাকা তো আর আমাকে দেয়নি, আমার শুধু স্বাক্ষর নিয়েছে। স্বাক্ষর করা ছাড়া উপায়ও ছিল না।’
তবে এসব বিষয় সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন আন্দুলবাড়ীয়া ইউপি চেয়ারম্যান মির্জা হাকিবুর রহমান লিটন। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো টাকা-পয়সা নিইনি।’ জীবননগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) অঞ্জন কুন্ড বলেন, ‘কাজগুলো পিআইসির মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই কাজ বুঝে নেয়া হবে। কে কাজ করলো বা করলো না, সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা টিআর বা কাবিখা প্রকল্পে কোনো ভ্যাট বা আয়করের অর্থ নিইনি।’
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার জীবননগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আল-আমীনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যার কারণে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক