চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলায় পদযাত্রা ও পথসভা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে দিনভর এ দুটি জেলার বিভিন্ন স্থানে পদযাত্রা ও পথসভা করেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
চুয়াডাঙ্গা:
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘২০২৪-এর রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিলো। বিবিসির একটি প্রতিবেদনে আপনারা সকলেই দেখেছেন, শেখ হাসিনা নিজেই জুলাই অভ্যুত্থানে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, এই সকল হত্যাকাণ্ডের জন্য খুনি হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ দায়ী। সেই খুনি হাসিনা এখন ভারতে অবস্থান করছে। ভারত সরকার গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতা-কর্মীদের নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের সীমান্ত এলাকায় বাংলদেশি কৃষকদের হত্যা করা হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে সাত দিন আগে হত্যা করে সাত দিন পর সেই কৃষকের লাশ ফেরত দিয়েছে ভারত। বিএসএফ কোনো সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, খুনি বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষকে খুন করায় যেন তাদের একমাত্র দায়িত্ব। গত ৫৪ বছর ধরে আমাদের দেশের নাগরিক, জনগণকে গোলামীর জীবনযাপন করতে হয়েছিল, তাদের মানবিক মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে ভারতীয় আধিপত্যবাদ দ্বারা। সীমান্তে আমাদেরকে খুন করা হয়েছে, আমাদের পানি চুক্তি, পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়া হয়নি। আমাদেরকে রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে, স্বাংস্কৃতিকভাবে বারবার অবদমন করা হয়েছে।’
গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে তিনটায় এনসিপির ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রায়’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চুয়াডাঙ্গা শহরের শহীদ হাসান চত্বর চৌরাস্তার মোড়ে এক পথসভায় এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। এসময় তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরকার ১৬ বছর টিকে ছিলো এবং গুম-খুন করেছে, নির্বিচারে মানুষকে হত্যা করেছে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সমর্থনে। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, বাংলাদেশের সীমান্তে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। বাংলাদেশের জনগণকে, বাংলাদেশের সীমান্তকে, বাংলাদেশের মাটি ও মানচিত্রকে রক্ষা করা বাংলাদেশের ছাত্র, তরুণ, যুবকদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব আমরা নিয়েছি এবং সেই দায়িত্বের ভিত্তিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি কাজ করবে।’
চুয়াডাঙ্গার প্রেক্ষাপটের উদাহরণ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা থেকে বলতে চাই, গত ৫৪ বছরে এই জেলার সীমান্তেই অন্তত ২০০ মানুষসহ সারাদেশের সীমান্তে হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সীমান্তে গরু চালানকারী, পাচারকারী বলে গরিব কৃষকদের হত্যা করা হচ্ছে। অথচ ৫৪ বছরেও কোনো সরকার এর সুষ্ঠু কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বলব, আপনাদের কঠিন হতে হবে। আমরা কোনো সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকবো না। বাংলাদেশের জনগণ, ছাত্র তরুণরা অবশ্যই তার দেশকে, মানচিত্রকে, সীমান্তকে রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণ করবে। সীমান্তে কৃষককে হত্যা আমরা মেনে নেব না।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়, সমতা, ন্যায্যতা এবং মর্যাদার ভিত্তিতেই সেই সম্পর্ক হতে হবে। বাংলাদেশই কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারতের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল, এটা যেন ভারত কোনোভাবেই ভুলে না যায়। গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা বৈষম্যহীন সম্প্রীতির বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, কিন্তু নানা ধরণের রাজনৈতিক প্রহসনে বহু মানুষ মারা যাচ্ছে, চাঁদাবাজ, দুর্নীতি, দখলদারিত্বে পুরো বাংলাদেশ ছেয়ে গেছে। চুয়াডাঙ্গাবাসীকে আমরা বলতে এসেছি, আপনারা ভয় পাবেন না, আপনাদের সন্তানরা, ছোট ছোট বাচ্চারা রাজপথে নেমেছিলো ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী হাসিনার বিরুদ্ধে। তারা ভয় পায়নি, বাংলাদেশকে নতুন করে স্বাধীনতা দিয়েছিলো, মুক্তি দিয়েছিলো, আপনাদের সন্তানেরা, আমাদের দেশের নারীরা, আলেম সমাজ, হিন্দু-মুসলমান সবাই একত্রে। নতুন করে কোনো ভয়ের সংস্কৃতি আমরা বাংলাদেশে দেখতে চাই না। আপনাদের এলাকার দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, দখলদারিত্ব নিয়ে আপনারা কথা বলুন, যেই প্রতিবাদের জোয়ার বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, সেই জোয়ার বন্ধ হতে দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের ছাত্র-তরুণরা এই দেশের জনগণের পক্ষে আছে, রাজপথে আছে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের না করুন। যারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও দখলবাজদের পক্ষে আছে, আপনারা তাদেরকে বয়কট করুন। জণগণের পক্ষে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি গড়ে তুলুন। চুয়াডাঙ্গার মানুষের উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থানের পক্ষে দাঁড়ান। জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃবৃন্দ আপনাদের সঙ্গে থাকবে।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি দেশব্যাপী জুলাই পদযাত্রা শুরু করেছে, যে ফ্যাসিস্ট দলের নেত্রী স্বৈরাচার সরকারের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা নিজে নির্দেশনা দিয়ে হাজারের ওপরে মানুষ হত্যা করেছে, ১০ হাজারের ওপরে মানুষকে আহত করেছে। সেই মুজিববাদী ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে থাকতে পরে না। বাংলাদেশে কোনোভাবেই তারা আসতে পারবে না, যদি আসতে হয়, আমাদের জীবনের ওপর দিয়ে আসতে হবে। এই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিচার ও দেশ গঠনের জন্য যে সংস্কার এবং একটি নতুন সংবিধানের পক্ষে আপনাদেরকে দাঁড়াতে হবে। সেই বিচার, সংস্কার, নতুন সংবিধান এবং জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবিতে আমরা রাজপথে নেমেছি। আমাদের বার্তা এটাই, অভ্যুত্থানের নেতৃবৃন্দ এখনো রাজপথে আছে। আপনাদের হকের পক্ষে কথা বলছে, আপনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করুন, ইনশাহআল্লাহ আপনারা হতাশ হবেন না। জাতীয় নাগরিক পার্টি নতুন বাংলাদেশ, জনগণের পক্ষের বাংলাদেশ, ইনসাফের পক্ষের বাংলাদেশ আপনাদেরকে উপহার দেবে।’
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় মেহেরপুর জেলা থেকে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়া এলাকায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পথযাত্রায় গাড়িতে বসেই মতবিনিময়ের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা জেলার ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির সূচনা করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এসময় আশপাশের স্কুলের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের এখন স্কুলে থাকার কথা, ক্লাস ফেলে এখানে চলে আসা একদম ঠিক হয়নি। পড়াশোনা বাদ দিয়ে আমাদের দেখতে আসা তোমাদের কাজ না।’
তবে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘তোমাদের এই ভালোবাসা দেখে হৃদয় কেঁপে উঠেছে। আমরা যেন এই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারি। জীবন দিতে হলেও দেব। তোমরা মন দিয়ে পড়াশোনা করো। আমাদের চেয়েও বড় হও, এমন কিছু করে দেখাও, যাতে আমরা গর্ব করতে পারি।’ এরপর পদযাত্রাটি আলমডাঙ্গা শহরের আল-তায়েবা মোড়ে গিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে। সেখানে বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘এনসিপি বাংলাদেশের সকল মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এনসিপি বাংলাদেশের সকলকে সাথে নিয়ে এমন একটি বাংলাদেশ গঠন করতে চায়, যে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো বৈষম্য থাকবে না। আমরা আমাদের শহীদ ভাই, আহত ভাইদের রক্তকে বৃথা যেতে দেব না।’
সারজিস আলম বলেন, ‘একটি অভ্যুত্থানের পরে আমাদের রাজনীতিতে আসার প্রয়োজন ছিল না। আমরা রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আমরা দেখছি, আমরা যদি এখান থেকে একটু সরে যায়, চাঁদাবাজ-লুটপাটকারী সিন্ডিকেটের কালো হাতগুলো আবার সিস্টেমগুলো দখল করবে। আমাদের ডাকে যে ভাই-বোনেরা রক্ত দিলো, তাদের আমানতের আমরা খেয়ানত করতে পারি না।’
দিনভর বৃষ্টির মধ্যে চুয়াডাঙ্গার পৃথক ৫টি স্থানে এনসিপির নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ তাঁদেরকে শুভেচ্ছা জানায়। পদযাত্রায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, ডা. তাসনিম জারা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
আলমডাঙ্গা:
‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার রূপান্তর ছাড়া কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ সম্ভব নয়’- চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পথসভায় এমন মন্তব্য করেছেন দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। গতকাল বুধবার বেলা একটায় আলমডাঙ্গার আল-তায়েবা মোড়ে অনুষ্ঠিত ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে এনসিপির কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নেতারা বক্তব্য দেন।
প্রধান বক্তা আখতার হোসেন বলেন, ‘আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে ধর্ম, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হবে। দেশের মানুষ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত, আমরাও প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সংবিধান সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। আমরা এমন একটি নতুন সংবিধান চাই, যেখানে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা হবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।’ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমলে জনগণের অধিকার বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ভারত সরকার তাকে আশ্রয় দিয়ে মানবতাবিরোধী অবস্থানে গেছে- এটি ইতিহাসে কলঙ্ক হিসেবেই লেখা থাকবে।’
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব মোল্লা মোহাম্মদ ফারুক এহসান। ফারুক এহসান তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, ‘আলমডাঙ্গায় ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে জোর করে চাঁদা তোলা হচ্ছে, যা বন্ধ হওয়া উচিত। আমরা প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি- এসব চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
হাটবোয়ালিয়া:
‘দেশ গড়ার নতুন প্রত্যয়ে’ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত পদযাত্রা গতকাল বুধবার সকালে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার হাটবোয়ালিয়ায় উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। হাটবোয়ালিয়া বাজারের চার রাস্তার মোড়ে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছিল জনতার ভিড় ও উচ্ছ্বাস। বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেও নানা শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজনটি রূপ নেয় জনসমুদ্রে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন এই কর্মসূচিতে।
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত পদযাত্রায় মানুষের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বৃষ্টি উপেক্ষা করে স্থানীয়রা সকাল থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন এনসিপি নেতৃবৃন্দকে এক নজর দেখার জন্য। বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময় সকাল ৯টার বদলে দুপুর ১২টার দিকে নেতৃবৃন্দ গাড়িবহর বাজারে পৌঁছালে উপস্থিত জনতার মাঝে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। যদিও নেতারা গাড়ি থেকে নামতে পারেননি, তবুও গাড়ির জানালা খুলে কুশল বিনিময় করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ হাসান, সদস্যসিচব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, মোল্লা মো. ফারুক এহসান ও ডা. তাসনিম জারা। পদযাত্রায় বক্তব্য দেন দক্ষিণবঙ্গের ডেপুটি মুখ্য সচিব আতাউল্লাহ।
দর্শনা:
দামুড়হুদা উপজেলার ঝাঁঝাঁডাঙ্গা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত ইব্রাহিম হোসেন বাবুর বাড়ি পরিদর্শন করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর কেন্দ্রীয় নেতারা। ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলের একটি প্রতিনিধি দল ইব্রাহিমের গ্রামের বাড়িতে যান। নিহত ইব্রাহিমের বাবা নুর ইসলাম, মা, স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান এবং পরিবারটির হাতে অনুদানও তুলে দেন। এরপর নেতারা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঝাঁঝাঁডাঙ্গা সীমান্তের মাথাভাঙ্গা নদীর এপার থেকে ৭৯ নম্বর সীমান্ত পিলার সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখেন। এসময় সারজিস আলম বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা সফরের সময় আমরা জানতে পারি বিএসএফের গুলিতে ঝাঁঝাঁডাঙ্গা গ্রামের যুবক ইব্রাহিম নিহত হয়েছেন এবং সাত দিন পর তার মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি আমাদের ব্যথিত করে। তাই আমরা সরাসরি তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে ছুটে এসেছি।’ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই- সীমান্তে ঘাস কাটতে গিয়ে কোনো বাংলাদেশি যেন আর গুলির শিকার না হয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে বাংলাদেশিদের হত্যা বন্ধ করতে হবে। বিএসএফ বারবার অজুহাত তুলে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন। এটি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মানবিক মর্যাদার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত ৫০ বছরে ১২০০-এর বেশি বাংলাদেশি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ফেলানী হত্যার মতো ঘটনাগুলো এখনও বিচার পায়নি। সীমান্তে এভাবে হত্যা চলতে দেওয়া যায় না। এটি কোনো রক্ষীবাহিনীর কাজ নয়, বরং হত্যাকাণ্ডে জড়িত বাহিনী হয়ে উঠছে বিএসএফ। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই।’
পরিদর্শন শেষে নেতারা সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে দেশব্যাপী গণসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং বলেন, এ নিয়ে নীরব থাকা চলবে না। ভারতের সঙ্গে মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায় বাংলাদেশ, নতিস্বীকার নয়।
ঝিনাইদহ:
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। তারা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ গতকাল বুধবার রাতে ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ উপলক্ষে আয়োজিত পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে বলেন, ‘মধ্য এশিয়ার টেরোরিস্ট গুজরাটের কসাই মোদি আরেক টেরোরিস্ট শেখ হাসিনাকে প্রশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে।’
হাসনাত দাবি করেন, ‘দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। দেশের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ভারতে বসে শেখ হাসিনা বিপ্লবীদের হত্যার পরিকল্পনা করছে। আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মারা লন্ডন ও দিল্লি থেকে ষড়যন্ত্র করে কিছুই করতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিচার ও সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনো নির্বাচন হবে না। এই যুদ্ধ নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের যুদ্ধ। আগে পুরোনো অপরাধের বিচার এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে। এরপরই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। আমরা এমন কোনো নির্বাচনে যেতে চাই না, যেখানে বিচারহীনতা থাকবে।’
হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের পেশাগত অনিশ্চয়তা নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সাংবাদিককে কেবল একটি পরিচয়পত্র ও মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়- এলাকায় গিয়ে নিজ দায়িত্বে খেয়ে-পরে চল। এটি গণমাধ্যমের প্রতি চরম অবমাননার শামিল।’
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সীমান্ত হত্যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ সীমান্তে বিএসএফ পাখির মতো গুলি করে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করছে। এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। আমরা বিএসএফকে খুনি বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করি। এখনই এদের বিরুদ্ধে জাতীয়ভাবে অবস্থান নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ঘরে ফিরবো তখনই, যখন সংস্কার, নতুন সংবিধান, আ.লীগের বিচার এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়িত হবে।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা ডা. তাসনিম জারা, সারজিস আলম, তারেক রেজা, শহীদ রাকিবের মা হাফিজা খাতুন এবং শহীদ সাব্বিরের পিতা আমোদ আলী। সমাবেশ ঘিরে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে ছেয়ে যায়। দলীয় শীর্ষ নেতাদের ছবি সম্বলিত এসব প্রচারণায় সৃষ্টি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। নেতা-কর্মীরা বলছেন, এটি একটি নতুন রাজনৈতিক জাগরণের সূচনা। এনসিপির নেতারা জানিয়েছেন, জুলাই মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি চলবে, যেখানে ‘সংবিধান সংস্কার, বিচার, এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার’ অঙ্গীকার তুলে ধরা হবে।
সমীকরণ প্রতিবেদন