চুয়াডাঙ্গায় স্বাস্থ্য সহকারী পদে নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে অনুত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে। অভিযোগ উঠেছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মেধার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রভাব খাটিয়ে ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। এ ঘটনায় গত রোববার ও গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ প্রার্থীরা চুয়াডাঙ্গা জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় চত্বরে প্রতিবাদ জানান এবং পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেন।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী পদে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম ও স্বচ্ছতা ঘিরে ব্যাপক বিতর্কের মধ্যে জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তদন্তে গত ৩ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গঠিক দুটি তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত কার্যক্রম শুরু প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়াও, সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদকে বদলির কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অন্যদিকে, গতকাল সকাল ১০টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত নিজেদের যোগ্য দাবি করে অনুত্তীর্ণ প্রার্থীরা সিভিল সার্জন কার্যালয় চত্বরে অবস্থান নিয়ে পরীক্ষার ফলাফল বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষার দাবি জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। তারা গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বক্তব্য দিয়ে জানান, এই নিয়োগ পরীক্ষা ছিল একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট। অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা পরীক্ষা বাতিল ও পুনরায় গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন।
চাকরি প্রার্থীদের অভিযোগ, গত ২০ জুন চুয়াডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য সহকারী পদের নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে। পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ দেখিয়ে চূড়ান্ত করা ও এক এলাকার প্রার্থীকে আরেক এলাকায় মনোনীত করার মতো অনিয়ম দেখা গেছে। অথচ এতকিছুর পরও তড়িঘড়ি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে চেয়েছেন সিভিল সার্জন। তারা এই নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল, সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদকে প্রত্যাহার এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, আন্দোলনের খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সিভিল সার্জন কার্যালয় চত্বরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। উপস্থিত হয়ে সেনা সদস্যরা আন্দোলনরতদের সঙ্গে কথা বলে সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাস দেন। তবে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন আন্দোলনরতরা।
আন্দোলনরত প্রার্থীরা জানান, তারা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিয়েছেন এবং প্রশাসনের নিকট সঠিক বিচার প্রত্যাশা করছেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে আন্দোলরতের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে হাজির হন জামায়াতে ইসলাম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সবুজ হোসেন নামের এক আন্দোলনকারী বলেন, ‘আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করা একজন শিক্ষিত বেকার তরুণ। সরকারি চাকরির স্বপ্ন নিয়ে বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েছি। চুয়াডাঙ্গায় স্বাস্থ্য সহকারী পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই পরিশ্রম করেছি। বিজ্ঞপ্তিতে যে যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি যোগ্যতা আমার রয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেছিলাম বলেই আমি আশাবাদী ছিলাম, কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখি আমার নাম নেই। অথচ আমার এলাকা থেকে এমন প্রার্থী উত্তীর্ণের তালিকায় রয়েছে, যে আমার অর্ধেক নাম্বার পাওয়ার যোগ্যতাও রাখে না। তাহলে কি ফাঁস হওয়া প্রশ্নে তিনি পরীক্ষা দিয়েছেন নাকি অন্য সুবিধায় উত্তীর্ণ হয়েছেন? এই প্রশ্ন অধিকাংশ প্রার্থীর। উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, আমার মতো অনেক মেধাবী প্রার্থী বাদ পড়েছে শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক লেনদেন এবং রাজনৈতিক সুপারিশের কারণে। এটা কেবল একজন চাকরি প্রার্থীর স্বপ্ন ভাঙার ঘটনা নয়-এটা দেশের তরুণ সমাজকে হতাশার দিকে ঠেলে দেওয়ার এক নির্মম উদাহরণ। আমি বিশ্বাস করি, এই নিয়োগের পেছনে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। তাই আমরা চাই অবিলম্বে এই প্রক্রিয়া স্থগিত করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক।’
আরেক অনুত্তীর্ণ প্রার্থী তামান্না খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই অন্যায় মেনে নিতে পারি না। মেধা উপেক্ষা করে যেভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দুর্নীতি। সিভিল সার্জন আমাদের দাবি মানতে নারাজ। তাই আমরা হাইকোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত, পরীক্ষা বাতিল ও পুনরায় পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’
তবে এই বিষয়ে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান এবং নিয়োগ বোর্ডের সদস্যসচিব ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাত থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। লিখিত পরীক্ষা কেন্দ্র, সিট প্লান, ফলাফল ঘোষণা এবং মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলে উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশ সকল ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ দেখা দেয়। জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়া এই ঘটনা নিয়ে এখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক