রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

দর্শনায় ২৫ বছরে আর্সেনিকে ২৬ জনের মৃত্যু

আক্রন্ত ৪৬৭ জন, জীবন কাটছে বিষের সঙ্গে যুদ্ধ করে
  • আপলোড তারিখঃ ২২-০৬-২০২৫ ইং
দর্শনায় ২৫ বছরে আর্সেনিকে ২৬ জনের মৃত্যু

পানির অপর নাম জীবন হলেও দর্শনায় সেই পানিই হয়ে উঠেছে মৃত্যুর কারণ। গত ২৫ বছরে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা থানাধীন বড় দুধপাতিলা ও ডিহিকৃষ্ণপুর গ্রামের গাবতলাপাড়ায় আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো প্রায় ৪৬৭ জন নারী-পুরুষ শরীরে আর্সেনিকের ক্ষত নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন চরম দুর্দশায়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানি যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনি কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে ভূগর্ভস্থ পানি। দর্শনার দুই গ্রামে শত শত টিউবওয়েলে পাওয়া যাচ্ছে ভয়ংকর মাত্রার আর্সেনিক। বিষাক্ত পানি পান করে অজান্তেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।


দর্শনার বড় দুধপাতিলা গ্রামের ২৫৮টি পরিবারের অন্তত ৪০০ জন এবং ডিহিকৃষ্ণপুর গাবতলাপাড়ার ৬০ থেকে ৬৫ পরিবারের প্রায় ১৮৫ জন মানুষ আর্সেনিক আক্রান্ত। এসব এলাকার টিউবওয়েল থেকে প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করা পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি মিলেছে।


স্থানীয়রা জানান, বড় দুধপাতিলা গ্রামে আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে গত ২৫ বছরে মৃত্যুবরণ করেছেন-রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল মান্নান মেম্বর, তাঁর স্ত্রী মাজেদা খাতুন, দলু মন্ডলের ছেলে মিনারুল ইসলাম, আবু বক্করের ছেলে ভাষরুল ইসলাম, আব্দুর রহিমের ছেলে আজিজুল ইসলাম, করিম জোয়াদ্দারের ছেলে নুর ইসলাম, আব্দুস সুবাহানের ছেলে আফসার আলী, আকবার আলীর ছেলে আয়তুল্লাহ, রমজান আলীর ছেলে গাজির উদ্দিন মন্ডল, আব্দুর ছাত্তারের মেয়ে রেনুকা খাতুন ও সাদু খাতুনসহ মোট ১৪ জন। ডিহিকৃষ্ণপুর গ্রামে মৃত্যুবরণ করেছেন আব্দুস সাত্তার, হাফিজুল, হায়দার, ডাবলু, বাবলু, লাবলু, সাহার আলী, নছিরন বেগম, আজিজুল, আমজেদ, আমানত ও জামাল হোসেনসহ ১২ জন।


বড় দুধপাতিলা গ্রামে বর্তমানে আর্সেনিক আক্রান্ত স্বাস্থ্য কার্ডধারী রয়েছেন অন্তত ২৫০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন-রুবেল হোসেন (৩৫), রহিমা খাতুন (৫৫), বাবুল হোসেন (৩৭), সামিরন খাতুন (৪৮), আরসাদ আলী (৪৬) সহ প্রায় ৪০০ জন। এ এলাকায় ২৫৮টি টিউবওয়েলে আর্সেনিক পাওয়া গেছে।


জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১১ হাজার ২২টি শ্যালোমেশিনের মধ্যে ১ হাজার ৮৬৪টিতে আর্সেনিক ধরা পড়েছে। দর্শনা পৌরসভার ৪ হাজার ৭৭৩টি টিউবওয়েলের মধ্যে ১ হাজার ৬৭টিতে রয়েছে আর্সেনিক।


এদিকে, ২০০২ সালে জাইকার সহায়তায় বড় দুধপাতিলা মসজিদপাড়ায় আব্দুল মান্নানের বাড়িতে একটি আর্সেনিকমুক্ত ওয়াটার ট্যাংক স্থাপন করা হলেও তা এখন অকেজো। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহযোগিতায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ ও চুয়াডাঙ্গা রিসো সংস্থা বড় দুধপাতিলায় ১৬৮টি পরিবারের জন্য একটি পাইপলাইন ওয়াটার সাপ্লাই ট্যাংক স্থাপন করে। জমি দেন আজিবর রহমান। উদ্বোধন করেন সাবেক সংসদ সদস্য আলী আজগার টগর ও তৎকালীন জেলা প্রশাসক সায়মা ইউনুস। এই ট্যাংক পরিচালনা করছেন গ্রামের বকুল হোসেন। 


চুয়াডাঙ্গা রিসো সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জাহিদ জানান, বড় দুধপাতিলা ও হরিরামপুরে এধরনের দুটি ট্যাংক স্থাপন করা হয়।


ডিহিকৃষ্ণপুর গাবতলাপাড়ায় আর্সেনিক আক্রান্তদের একজন বাহার মণ্ডল বলেন, প্রতিদিন তিন-চারবার পানি আনতে যেতে হয় অন্যের বাড়িতে। গ্রামের যুবক সবুজ জানান, ১৯৯৯ সালে প্রথম আর্সেনিক শনাক্ত হয় তাদের পানিতে। এখনো অনেক সময় ভুল করে ট্যাংকের বদলে টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করতে হয়।


স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের উত্তর পাড়ায় আরেকটি আর্সেনিকমুক্ত পাম্প স্থাপন জরুরি। আক্রান্তদের শরীরে দেখা দিচ্ছে আর্সেনিক বিষক্রিয়ার ভয়ংকর লক্ষণ-হাত-পায়ের চামড়া পুরু হয়ে যাওয়া, পিগমেন্টেশন, স্পট, আঙুল বেঁকে যাওয়া, দেহে সাদা-কালো দাগ, ত্বকের ক্যান্সার, হজমে সমস্যা, বুক-পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, হৃদযন্ত্রের জটিলতা এমনকি গর্ভকালীন শিশুর বিকাশে বাধা।


এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘সর্বপ্রথম সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। আমি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’


অন্যদিকে, জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।




কমেন্ট বক্স
notebook

চুয়াডাঙ্গায় সুজনের জেলা কমিটির অগ্রগতি পর্যালোচনা ও পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত