চুয়াডাঙ্গার আকাশে-বাতাসে বইছে আগুনের ফুলকি। চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে চলা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ জনজীবনে নিয়ে এসেছে চরম অস্বস্তি। গতকাল শনিবার বেলা ৩টায় জেলার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি মৌসুমে এত তাপমাত্রা উঠেছে প্রথমবারের মতো। গতকালসহ এ নিয়ে পর পর তিন দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হলো এ জেলায়। গতকাল তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা মাত্র ২৩ শতাংশে নেমে যায়। যা জনজীবনে অতি তীব্র গরমের প্রভাব আরও স্পষ্ট করে তোলে। এদিন, শহরের বিভিন্ন স্থানে সড়কে গলে গেছে রাস্তার পিচ। হাসপাতালে শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গরমজনিত কারণে অতিরিক্ত রোগীর ভর্তি হচ্ছেন। বিভিন্ন পশু খামারেও গরমে পশু মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, শিগগিরই মিলছে না স্বস্তি। আরও কয়েকদিন থাকবে তাপপ্রবাহ।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য মতে, গত শুক্রবার বেলা ৩টায় জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ দুদিনও চুয়াডাঙ্গায় ছিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সূচক অনুযায়ী, ৩৬ থেকে ৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত মৃদু তাপপ্রবাহ ধরা হয়। ৩৮ থেকে ৩৯.৯ মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪১.৯ তীব্র তাপপ্রবাহের অন্তর্ভুক্ত। তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে গেলে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। সে হিসেবে গতকাল থেকে এ জেলায় অতি তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা শহর ও আশপাশের এলাকায় দেখা গেছে, গরমের তীব্রতায় চারিদিকে হাস ফাঁস অবস্থা। যেদিকেই চোখ যায় শুধু প্রখর সূর্যের তীব্র চোখ রাঙানি। আকাশের কোনো দিকে নেই মেঘের দেখা। পুরো আকাশ ঝকঝকে। রোদে পুড়ছে পথ-ঘাট, বাতাসে যেন ঝরছে আগুনের ফুলকি। গ্রীষ্মের দাবদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালকরা বিপাকে পড়েছেন। শহরের কোর্টরোড, পুরাতন হাসপাতাল সড়ক, বড়বাজার শহিদ আবুল হোসেন সড়কের কয়েকটি স্থানে বিটুমিন গলে যেতে দেখা গেছে। আর গরমের কারণে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরায়ে নেমেছে ছন্দপতন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না অনেকেই। রিকশা ও ভ্যানচালকরা কাজ করতে হাঁপিয়ে উঠছেন। অনেককে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। রোদ-গরমের মধ্যেই অনেক দিনমজুরকে জরুরি কাজ করতেও দেখা গেছে। ঘামে তাদের পুরো শরীর ভিজে গেছে।
গতকাল সদর হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গত তিন দিনে এই হাসপাতালের ডায়রিয়া ও মেডিসিন বিভাগে অতিরিক্ত রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তিন দিনে হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে ১২১ জন নারী, পুরুষ ও শিশু, পুরুষ মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হয়েছে ৮৭ জন ও মহিলা মেডিসিন বিভাগে ১৩৯ জন। এদিনে মোট ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৩৪৭ জন রোগী। এছাড়াও প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৫ শতাধিক রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকায় চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
তীব্র গরমে অতিষ্ঠ লালন ভক্ত ও দিনমজুর ফকির আক্কাস আলী বলেন, ‘আমরা সাধক মানুষ যে গরম সহ্য করতে পারবো, সাধারণ মানুষ তা পারবে না। দিনমজুরদের জন্য খুবই কষ্টকর। সপ্তাহে দু তিনদিন কাজ হচ্ছে। বসে থাকতে হচ্ছে।’
চুয়াডাঙ্গা শহরের একজন মুরগি খামারি আফজালুল হক বলেন, ‘তীব্র গরমে পোল্ট্রি, লেয়ার, কালার বার্ড, সোনালিসহ বিভিন্ন জাতের মুরগি মারা যাচ্ছে। এছাড়া ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আরও বেশি হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। এতে খামারিদের পথে বসার অবস্থা হয়ে পড়েছে।’
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শরবত বিক্রেতা আলামিন হোসেন বলেন, ‘গরমে ফ্যানের বাতাসেও বসা যাচ্ছে না। পড়াশোনার পাশাপাশি একটা সরবতেরর দোকান দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ ভালো বিক্রি হচ্ছে।’
কলেজছাত্র রাকিব হোসেন বলেন, ‘গরমে বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই। জরুরি কাজ ছিল তাই বের হয়েছিলাম। কিন্তু খুব কষ্ট হচ্ছে। দ্রুত বাড়ি যেতে পারলে বাঁচি।’
ইজিবাইক চালক জহির আলী বলেন, ‘গরমে বেশিরভাগ সময় বসেই থাকতে হচ্ছে। গরমে ভাড়া হচ্ছে না খুব একটা। প্রচণ্ড গরম, সবদিক থেকে সমস্যা।’
রিকশা চালক রমেন সরকার বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে ভাড়া-ভুতো হচ্ছে না। যেখানে পারছে গাছের তলায় বসে আছে। তারপরও আশায় আছি, যদি কোনো ভাড়া হয়। ভাড়া না হলে সংসারে টান পড়বে।’
চুয়াডাঙ্গা সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনজুরুল করিম বলেন, ‘বিভিন্ন সড়কে পিচ গলে যাওয়ার খবর পেয়েছি। সেসব স্থানে বালু ছিটানো হচ্ছে, যাতে যান চলাচলে সমস্যা না হয়। গরম আরও বাড়লে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।’
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে কয়েকদিনন ধরে মাঝারি থেকে তীব্র ও অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। শনিবার চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। যা দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এই তাপপ্রবাহ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।’
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রকিব সাদী বলেন, ‘বর্তমানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে পৌঁছেছে। এতে গরমজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষদের জন্য এ সময়টা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘গরমে সুস্থ থাকতে দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার পানি পান করা উচিত। হালকা খাবার খাওয়া, রোদ এড়িয়ে চলা, এবং ছাতা বা টুপি ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছি। যদি কারও মাথা ব্যথা, বমি ভাব বা দুর্বলতা অনুভব হয়, তাকে দ্রুত ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে বিশ্রাম দিতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এছাড়া ঠান্ডা পানি বা খাবার স্যালাইন গ্রহণ শরীরের পানিশূন্যতা রোধে কার্যকর।’ এই চিকিৎসা কর্মকর্তা তীব্র গরমে অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি এড়িয়ে চলাতে পরামর্শ দেন। এবং অফিস, স্কুল এবং নির্মাণস্থলের মতো স্থানেও সচেতনতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ দেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক