তিন মিনিট ইনজুরি টাইমেরও ইনজুরি টাইমে ভারত তাদের গোলরক্ষক মুন্নীকে তুলে নামায় সুরাজমনি কুমারীকে। উদ্দেশ্য টাইব্রেকার ঠেকিয়ে দলকে চ্যাম্পিয়ন করানো। পেনাল্টি শুট আউটের প্রথম শটেই সফল এই দীর্ঘদেহী কিপার। বাংলাদেশ স্ট্রাইকার এবং আসরে পাঁচ গোল করা সৌরভী আকন্দ প্রীতির শট রুখে দেন তিনি। পিছিয়ে পড়া সাইফুল বারী টিটু বাহিনী শেষ পর্যন্ত এই টাইব্রেকারেই জিতে অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা সাফের শিরোপা জিতেছে। আর তা গোলরক্ষক ইয়ারজান খাতুনের অসামান্য দৃঢ়তায়। স্পট কিকে একে একে তিনটি শট আটকে দেন তিনি। ফলে আবার ভারতকে হারিয়ে সাফের শ্রেষ্ঠত্ব লাল-সবুজ মেয়েদের। গতকাল নেপালের ললিতপুরের আনফা অ্যাকাডেমির চিয়াসাল স্টেডিয়ামের ফাইনালের ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ এ শেষ হওয়ার পর খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। সেই ১০ শটের স্পটকিকে ভারতকে ৩-২ গোলে হারিয়ে প্রথম শিরোপার দেখা সৌরভী আকন্দ প্রীতি, থুইনুয়ে মারমা, অর্পিতা বিশ্বাস, আলপি খাতুনদের। সে সাথে মহিলা দলের নতুন কোচ টিটুর অধীনে বয়সভিত্তিক সাফে টানা দুই শিরোপা। গত ফেব্রুয়ারিতে টিটুর কোচিংয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ সাফে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। যদিও তা ভারতের সাথে যৌথভাবে।
কাল এই ফাইনালের আগ পর্যন্ত ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। লিগের তিন ম্যাচেই জয় অর্পিতা বিশ্বাসদের। ভারতকে তো ৩-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে গতকালের ফাইনালে ৫ মিনিটেই লিড নিয়ে ভারত ম্যাচে ছড়ি ঘোরাতে থাকে প্রীতি-বিথীদের ওপর। লব থেকে বল পেয়ে বক্সে ঢুকে গোলরক্ষক ইয়ারজানের পোস্ট ছেড়ে বের হয়ে না আসার সুযোগে কাজে লাগান আনুস্কা কুমারী। এরপর বামপায়ের শটে বল জালে পাঠান। পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ দল আর সুবিধাই করতে পারছিল না। মাঝ মাঠে ছন্ন ছাড়া লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। ভারত ব্যবধান বৃদ্ধির চেষ্টা চালায়। অবশ্য বাংলাদেশ রক্ষণভাগের প্রতিরোধে প্রতিপক্ষরা দ্বিতীয় গোল আর পায়নি। এভাবেই চলছিল খেলা। টিটু বাহিনীও পারছিল না ভারতীয় কিপারকে পরীক্ষায় ফেলতে।
তবে বাংলাদেশ দলের অন্যতম ভরসা ছিল কর্নার থেকে গোল পাওয়া। ৭০ মিনিটে সেই কর্নার থেকেই সমতা সূচক গোল। প্রথমে আলফি খাতুনের ফ্রি-কিক ভারতের গোলরক্ষকের হাত ফসকে কর্নার হয়। সেই কর্নার থেকে চিয়াসাল স্টেডিয়ামসহ টিভি ও মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখা বাংলাদেশীদের উল্লাস। অনন্য বীথি মুন্ডার কর্নারে মরিয়ম বিনতে হান্নার ভলি ভারতের জালে। এরপর ৭৪ মিনিটে অনন্যার ফ্রি-কিক ভারতের গোলরক্ষকের সোজা গেলে এগিয়ে যেতে পারেননি অর্পিতা বিশ্বাসরা।
ভারতের রক্ষণভাগে সারাক্ষণই আতঙ্ক ছড়ান সৌরভী আকন্দ প্রীতি। বল হোল্ড করা, ড্রিবলিং, পাসিং সবই ভালো হচ্ছিল তার। কিন্তু পোস্টে শট নেয়ার মতো সুযোগ পাননি। ম্যাচে সমতা আসার পর ভারতও গোলের সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ। ফলে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে।
২০১৯ সালে ভুটানের মাঠে অনূর্ধ্ব-১৫ সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ টাইব্রেকারে হেরেছিল ভারতের কাছে। সে বার অধিনায়ক ছোট শামসুন্নাহারের প্রথম শট ক্রস বারে লাগে। শেষ পর্যন্ত সেই মিসই গড়ে দেয় পার্থক্য। গতকাল প্রীতির প্রথম টাইব্রেকার শট যখন বাম দিকে শরীর ফেলে আটকে দেন ভারতের সুরাজমনি তখন ছয় বছর আগে ভুটানের থিম্পুর মাঠের সেই দুঃসহ স্মৃতি চোখে ভাসছিল। তবে চাংলিমিথান স্টেডিয়ামে সেদিন বাংলাদেশ কিপার রুপনা চাকমা কোনো শট ঠেকাতে না পারলেও কাল ব্যতিক্রম ছিলেন এই প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ইয়ারজান। সাভিতা রানীর প্রথম শটে কিছু করতে না পারলেও এলিনা দেবীর দ্বিতীয় এবং বোনিফিল্লা সুল্লাইয়ের শট ঠেকিয়ে দেন। দু’বারই বল তার হাতের বাধা ডিঙ্গিয়ে পোস্টে লাগে। ফলে তৃতীয় শট শেষে ২-১-এ এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। এর আগে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শটে গোল করেন যথাক্রমে বাংলাদেশে মারিয়ার বিনতে হান্না এবং থুইনুয়ে মারমা। এই অবস্থায় চতুর্থ শট পোস্টে মারেন বাংলাদেশের আলপি খাতুন। এরপর ভারতের আনউইতা রঙ্গনাথান গোল করলে স্কোর হয়ে যায় ২-২। পঞ্চম শটে বাংলাদেশের আরিফা আক্তার বল জালে পাঠানোর পর সবাই তাকিয়ে ছিল ইয়ারজানের দিকে। তিনি পঞ্চম শট আটকাতে পারলেই শিরোপা উৎসব। সেই প্রত্যাশাই পূরণ করেছেন ইয়ারজান। ভারতের দিভইয়ানি লিন্ডার শট বাম দিকে হেলে রুখে দেশকে মহিলা ফুটবলে আরেকটি সাফ ট্রফি এনে দেন। এর মাধ্যমে প্রতিটি বয়সভিত্তিক মহিলা সাফেরই প্রথম শিরোপা থাকল বাংলাদেশের দখলে। তবে লিগ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে গোল করা আলপি এবং প্রীতি কাল টাইব্রেকারে ব্যর্থ হলেন। যদিও মহিলা ফুটবলে এই প্রথম ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়।
চ্যাম্পিয়নশিপের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক হয়েছেন ইয়ারজান। আর মোস্ট ভেলুয়েবল ফুটবলারের পুরস্কার গেছে সৌরভী আকন্দ প্রীতির দখলে। তিনি পাঁচ গোল করেন। ছয় গোল দিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন ভারতের আনুষ্কা কুমারী। বাংলাদেশ দল : ইয়ারজান, অর্পিতা, আরিফা, শিউলী, হান্না, ক্রানুচিং (বীথি ৫০ মি.), সাথী, আলপি, থাইনুয়ে, ফাতেমা (মৌমিতা ৫২ মি.), প্রীতি।
সমীকরণ প্রতিবেদন