পর্ব-০২ : ভারতের রাজা গেস্ট হাউজে বৈঠকে সাইফুলকে খুনের পরিকল্পনা করে নজরুল মল্লিকরা : স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসায় ১% শেয়ারের শর্তে খুনের দায়িত্ব নেয় মুকুল-শাহীন : রেকির দায়িত্বে দর্শনার মান্নান-আলম
- আপলোড তারিখঃ
১৭-০৭-২০১৭
ইং
বিশেষ প্রদিবেদক: ২০০৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দামুড়হুদা থানার লোকনাথপুর এলাকায় বিডিআর কর্তৃক ১২ কেজি ৯৫০ গ্রাম স্বর্ণ আটক হলে স্বর্ণের মূল মালিকগণ বিডিআর’র সংবাদদাতাকে খুজতে আরম্ভ করে। এক পর্যায়ে তারা নিশ্চিত হতে পারে দর্শনা শ্যামপুরের সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম স্বর্ণগুলো ধরিয়ে দিয়েছে। এরপর ওই স্বর্ণ চোরাচালানীরা পৃথিবী থেকে সাইফুলকে সরিয়ে দিতে একমত পোষণ করে।
এই মামলার অন্যতম আসামী পরিতোষ চক্রবর্তীর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ও অভিযোগপত্রের বর্ণনা অনুসারে জানা যায়, নিহত সাইফুল ইসলাম তার সিএন্ডএফ ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যবসা করতো। স্বর্ণ চোরাচালানের কাজে তাকে সহযোগিতা করতো শ্যামপুর গ্রামের ইউসুফ ওরফে তেলা ইউসুফ, মোবারক পাড়ার মান্নান, তোতা, বাংলা এবং ইসলাম বাজারের সন্টু। চোরাচালানকৃত স্বর্ণের মূল মালিক ঝিনাইদহের পরিতোষ চক্রবর্তী ও আনোয়ারুল আজিম ওরফে আনার কমিশনার, জীবননগরের নজরুল ইসলাম ওরফে নজু, কুষ্টিয়া পোড়াদহের কামরুজ্জামান ওরফে জন ও ভারতের বিজন হালদার। স্বর্ণ চোরাচালানের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে সাইফুলের সাথে বিরোধ দেখা দিলে মান্নান সাইফুলের বেশ কিছু টাকা আটকে দেয়।
এ ব্যাপারে আনার কমিশনার, পরিতোষ চক্রবর্তী (মৃত) ও ভারত থেকে বিজন হালদার সাইফুলের অফিসে বসে ওই বিরোধ মিমাংসা করে দেয়। এরপর থেকে সাইফুল মান্নানের সাথে ব্যবসা বন্ধ করে তেলা ইউসুফের সাথে ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। মান্নান তার অন্যান্য সহযোগীদের সহায়তায় ব্রাইট এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে স্বর্ণচোরাচালানের ব্যবসা আরম্ভ করে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী দেশে জরুরী অবস্থা জারি হলে সাইফুল ইসলাম স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যবসা করতে অপারগতা প্রকাশ করে। স্বর্ণ চোরাচালানের মূল সিন্ডিকেট স্বর্ণ চোরাচালানের ব্যবসা বন্ধ না করে ব্রাইট এন্টারপ্রাইজ ও সাইফুলের কর্মচারী তেলা ইউসুফের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে।
২০০৭ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি দামুড়হুদা থানার লোকনাথপুর এলাকায় বিডিআর কর্তৃক ১২ কেজি ৯৫০ গ্রাম স্বর্ণ আটক হলে স্বর্ণের মূল মালিকগণ বিডিআর’র সংবাদদাতার সন্ধানে মাঠে নামে। এক পর্যায়ে তারা নিশ্চিত হতে পারে সাইফুলই তাদের স্বর্ণের চালান ধরিয়ে দিয়েছে। এরপর তারা সাইফুলকে খুনের সিদ্ধান্ত নেয়। খুনের পরিকল্পনা কোন ভাবে যেন ফাঁস না হয়, সেই গোপনীয়তা রক্ষার্থে স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের চার সদস্য রওনা হয় ভারতে। সেখানে রাজা গেস্ট হাউজে মহাজন খ্যাত দাদা বিজন হালদারের সাথে বাংলাদেশের নজরুল ইসলাম ওরফে নজু (নজরুল মল্লিক), আনোয়ারুল আজিম ওরফে আনার কমিশনার, শ্রী পরিতোষ চক্রবর্তী ও ফারুকুজ্জামান ওরফে জন এই চারজন বৈঠকে মিলিত হয়। ওই বৈঠকেই সাইফুলকে খুনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জন তার বন্ধু মুকুল ও শাহীনকে বৈঠকে হাজির করে। সাইফুলকে খুনের জন্য স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসার ১% শেয়ার দেওয়ার বিনিময়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় জনের বন্ধু কুষ্টিয়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী চরমপন্থী নেতা মো. আমিনুর রহমান ওরফে আমিনুল ইসলাম ওরফে মুকুল ও মো. শাহীন রুমীকে। মুকুল ও শাহীনকে খুনের কাজে সহযোগিতা করা ও সাইফুলকে চিনিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পায় সাইফুলের পুরাতন শক্র দর্শনার আব্দুল মান্নান। সাইফুলকে খুনের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তারা বাংলাদেশে ফিরে আসে।
স্বর্ণ চোরাচালান মামলার আসামী মান্নান, সন্টু, তোতাসহ অন্যান্য আসামীরা জামিনের জন্য হাইকোর্টে গেলে সেখানে পরিতোষ চক্রবর্তীও উপস্থিত হয় এবং মান্নানকে বিজন হালদারের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে বলে। মহামান্য হাইকোর্ট ৫৬ (ছাপান্ন) দিন অন্তবর্তীকালীন জামিন প্রদান করলে আসামীরা দর্শনায় ফিরে আসে। দর্শনায় ফিরে তারা সাইফুল হত্যাকান্ডের পরবর্তী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে দর্শনা রেলগেটস্থ সাইফুলের অফিসের আনুমানিক ২০০গজ উত্তরে ব্রাইট এন্টারপ্রাইজ অফিসে বৈঠক করে। এই বৈঠকে মান্নান, বকুল, আলম, সন্টু ও তোতা উপস্থিত ছিল। বৈঠকের এক পর্যায়ে কুষ্টিয়া হতে মোটরসাইকেলযোগে জন ও তার সহযোগী বন্ধু নাজিব বিশ্বাস ওরফে রেজা আসে। তারা সাইফুলকে দেখতে চাইলে মান্নান ও আলম সাইফুলকে চিনিয়ে দেয়। হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা চুড়ান্ত করে সকলের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য অন্তবর্তীকালীন জামিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার চারদিন পূর্বে মান্নান, সন্টু ও তোতা নি¤œ আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিজ্ঞ আদালত তাদেরকে জেল হাজতে প্রেরণ করে। মান্নানরা আদালতে আত্মসমর্পণ করার দিন অর্থাৎ ২০০৭ সালের ২৬ এপ্রিল সোনারগাঁও মটরস, ২৮ নিউ ইস্কাটন রোড, ঢাকা হতে ফারুকুজ্জামান ওরফে জন একটি হিরোহোন্ডা গ্লামার মোটরসাইকেল ক্রয় করে। পরে মোটরসাইকেলটি জনের কর্মচারী শহীদুল ইসলামের মাধ্যমে দর্শনার মান্নানের লোকজনের নিকট হস্তান্তর করে। ২০০৭ সালের ০১’লা মে মাগরিবের নামাজের পর সাইফুলকে হত্যা করার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে মান্নানের লোকজন খুনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুকুল ও শাহীনকে মোটরসাইকেলটি হস্তান্তর করে। তারা মোটরসাইকেল নিয়ে শ্যামপুর-জয়নগর রাস্তায় বেশ কয়েকবার ঘোরাফেরা করে রাস্তা চিনে নেয়। মাগরিবের নামাজের পূর্বে বাংলা শ্যামপুর ক্যাম্প মোড় ও বকুল, আলম, সাঈদ, পুরাতন বাজার মোড়ে অবস্থান নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সাইফুলকে খুন করাকালীন সময়ে বিডিআর ক্যাম্প ও দর্শনা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র হতে বিডিআর ও পুলিশ বাহির হলে যাতে খুনিদের সতর্ক করতে পারে এবং খুন করে খুনিরা যাতে নিরাপদে এলাকা ত্যাগ করতে পারে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করা। সাইফুল শ্যামপুর মসজিদ হতে মাগরিবের নামাজ শেষে পুরাতন বাজারের তার অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলে শ্যামপুর মসজিদের সামান্য পশ্চিমে দাড়িয়ে থাকা তেলা ইউসুফ খুনিদেরকে সাইফুল রওনা হওয়ার সংবাদ মোবাইল ফোনে জানিয়ে দেয়। সাইফুল শ্যামপুর জোড়াবটতলা নামকস্থানে পৌছালে পূর্ব হতে অন টেস্ট মোটরসাইকেল নিয়ে ওৎ পেতে থাকা খুনি দু’জন সাইফুলের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। মোটরসাইকেলের পিছনে থাকা ব্যক্তি তার হাতে থাকা পিস্তল দিয়ে আট/নয় রাউন্ড গুলি করে সাইফুলকে হত্যা করে। (চলবে......)
কমেন্ট বক্স