লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন
- আপলোড তারিখঃ
১৩-০১-২০২১
ইং
কালীগঞ্জে ঋণ দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ
প্রতিবেদক, কালীগঞ্জ:
অফিসের ফাইলপত্র, টেবিল চেয়ার, অন্যান্য জিনিসপত্র ঠিক একটা নামি-দামি অফিসের মতো। এখানকার কর্মকর্তাদের কথা-বার্তাও ছিল বেশ স্মার্ট। এরাই নাকি সদ্য গজিয়ে ওঠা ‘জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন’ এর কর্মকর্তা। তাদের কার্যক্রম বেশি দিনের না হলেও ঋণ দেওয়ার কথা বলে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় জমা নিয়ে রাতের আঁধারে উধাও হয়ে গেছে। এমন অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এক প্রতারক চক্রের এনজিও ‘জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন’। এনজিওটি কালীগঞ্জ শহরের নলডাঙ্গা রোডস্থ ফজলুর রহমানের বাসা ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালাতো বলে জানা গেছে। এদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর বলছে, তাদের কাছে এই নামের কোনো এনজিও’র তথ্য নেই। এ ঘটনায় প্রতারক এনজিওর বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, কালীগঞ্জ শহরের নলডাঙ্গা রোডস্থ ফজলুর রহমানের বাসা ভাড়া নিয়ে ‘জণকল্যাণ ফাউন্ডেশন’ নাম দিয়ে প্রতারণা ফাঁদ পেতেছিল। এরপর কয়েকজন কর্মকর্তা সেজে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় নিজেদের ফাউন্ডেশনের পরিচয়ে ভিজিটিং কার্ড দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথমে মালামাল কিনে কৌশলে সখ্যতা তৈরি করে। এরপর ২ বছর মেয়াদী ঋণ প্রজেক্ট আছে বলে প্রত্যেককে জানায়। কিন্তু শর্ত মোতাবেক প্রতি লাখ ঋণের জন্য ৭ থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত সঞ্চয় জমা দেয়ার নিয়ম রয়েছে এবং পরবর্তীতে এটা ফেরতযোগ্য। এতে রাজি হয়ে ঋণ নিতে আগ্রহীরা সঞ্চয় জমা দিতে থাকে। এরপর রাতের আঁধারে তাঁরা হাওয়া হয়ে গেছে।
পৌরসভার খয়েরতলা গ্রামের শরিফুল ইসলাম আরিফ নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ‘কয়েক দিন আগে আমার দোকানে এসে ২জন লোক নিজেদেরকে এনজিও কর্মকর্তা বলে পরিচয় দেয়। দোকানে ১ লাখ টাকা ব্যবসায়ী ঋণ দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা নেয়। গত শনিবার সকালে আমার ঋণ দেয়ার কথা। সেই মোতাবেক আমি তাদের দেওয়া ঠিকানায় যায়। সেখানে গিয়ে দেখি জনৈক এক বাড়ির পুরা এক ফ্লাটে জনকল্যাণ ফাউন্ডেশনের অফিস। সাইনবোড ঝুলানো আছে, কিন্তু এনজিওর কেউ নেই। অফিসটি তালাবদ্ধ। ’
শহরের কোটচাঁদপুর রোডের মদিনা থাই এ্যান্ড এসএস ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী তরিকুল ইসলাম জানান, ‘আমাকে ৫ লাখ টাকা ঋণ দিতে চেয়েছিলো। এ জন্য ১৫ হাজার টাকা সঞ্চয় জমা নিয়েছে। এখন দেখছি তারা লাপাত্তা।’
কালীগঞ্জ শহরের জুতা ব্যবসায়ী বার্মিজ ঘরের স্বত্বাধিকারী ছামছুল ইসলাম জানান, ‘কয়েক দিন আগে দুই ভদ্রলোক আমার দোকানে এসে জুতা কিনে নিজেদেরকে এনজিওর কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে একটি ভিজিটিং কার্ড দেন। এরপর বলেন, তাদের ঋণ প্রজেক্ট আছে। আমি ঋণ নেয়ার কথা বললে তারা রাজি হয়ে সঞ্চয় জমা দিতে বলেন। ২ দিন পরে ৪ লাখ টাকা ঋণ নেয়ার জন্য মোট ২৮ হাজার টাকা জমা দিই। বুধবারের দিন এনজিওর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে ঋণ দেয়ার কথা। শুধু আমি একা না আমার পাশের জুতা ব্যবসায়ী বার্মিজ সুয়ের মালিকের কাছ থেকে ৪০ হাজার, ড্যান্ডি সুয়ের দোকান মালিকের কাছ থেকে ৩৫ হাজার, জেরিন এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে ৩৫ হাজার, রিফাত গার্মেন্টস থেকে ৩৫ হাজার টাকা নিয়েছে।’
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সূত্রে আরও জানা গেছে, জানুয়ারির প্রথম থেকে এই প্রতারকচক্র কালীগঞ্জ পৌরসভার গোরস্থানপাড়া নলডাঙ্গা রোডের ফজলুর রহমানের বাড়ির একটি ফ্লাট ৫ হাজার টাকা মাসিক চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নাম দেয়। যেখানে এনজিও (এম আর সনদ নং- ০৯০০১৯০০৭৪) নামের একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে কালীগঞ্জ শহরের ছোট বড় বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে প্রথমে দু’একশ টাকা নিয়ে সদস্য করে। পরে সঞ্চয়ের কথা বলে টাকা নেয়া শুরু করে। সঞ্চয় বাবদ ৫ থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত জমা নিয়েছে। তারা ০১৮১৭-৪৬৯৪৪৩ নাম্বার, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার রিয়াজুল ইসলাম পরিচয়ে ০১৭৯৩-৩১২০৪৩ নম্বর থেকে কথা বলতেন। তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নং ঢাকা মেট্রো- হ-২৫-১৮৬৮।
এ ব্যাপারে কালীগঞ্জ থানার এস আই জাকারিয়া হোসেন জানান, ‘একটি লিখিত অভিযোগ পেয়ে তদন্তে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। দেখলাম অফিসে অনেক ফাইলপত্র। এলাকার লোকজন বলেন ৩-৪ দিন ধরে এনজিওর কক্ষে তালা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে।’
কালীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কৌশিক খান জানান, জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন নামের কোন এনজিও প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশনের তালিকায় নাই। ফলে এটা প্রতারকচক্র হতে পারে।
এবিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সূবর্ণা রানী সাহা জানান, ‘আমার কাছে এখনও কেউ কোনো অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
কমেন্ট বক্স