গর্ভের সন্তান বিক্রি করতে হলো না তহমিনার!
- আপলোড তারিখঃ
০২-১০-২০২০
ইং
মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত দেখালেন কালীগঞ্জ প্রেসক্লাবের নের্তৃবৃন্দ
প্রতিবেদক, কালীগঞ্জ:
অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তহমিনাকে ফেলে পালিয়েছেন স্বামী। নিরুপায় হয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন তিনি। বাবা আব্দুল মালেক চার বছর ধরে অসুস্থতায় শয্যাশায়ী। দুই বেলা দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে বৃদ্ধা মা শিশুদের কাপড় নিয়ে গ্রাম গ্রাম ঘুরে বিক্রি করেন। এভাবে তিনি যা রোজগার করেন, তা দিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটে তাঁদের। এমন অভাবের সংসারে তহমিনার সিজার করা জরুরি। কিন্তু কাছে একটি টাকাও নেই। বাধ্য হয়ে টাকার জন্য শ্বশুরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন তহমিনা। কিন্তু তিনি টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, সন্তান বিক্রির প্রলোভন দেখাচ্ছেন। গর্ভের সন্তান টাকার জন্য বিক্রির কথাটা কোনো মায়ের পক্ষেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও টাকার কাজ কথায় হয় না। তাই উপায়ান্তর না পেয়ে সন্তান বিক্রির শ্বশুরের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। কিন্তু গর্ভের সন্তান বলে কথা। বুকের ধন টাকার জন্য আরেকজনকে দিয়ে দিতে হবে। এটা নির্মমতা ভেবেই সন্তান রক্ষায় সন্ধ্যায় কালীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের মুখাপেক্ষী হন তহমিনা। তাঁর মুখের কষ্টজড়িত কথা শুনে সন্তান রক্ষায় এগিয়ে এসে যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের আশ্বাস দেন প্রেসক্লাব নের্তৃবৃন্দ। পরের দিন চিকিৎসকের পরামর্শানুযায়ী তহমিনার যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শেষ করে গত সোমবার দুপুরে কালীগঞ্জ হাসপাতালে সিজারের ব্যবস্থা করা হয়। তহমিনা একটি ফুটফুটে চেহারার পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এখন আর সন্তান হারানোর চিন্তা নেই। ওষুধ কেনার টাকার চিন্তাও নেই। তহমিনার বর্তমান ঠিকানা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌর এলাকার আড়পাড়া গ্রামে।
অসহায় তহমিনা খাতুন জানান, ৯ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছিল বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার পাঠামারা গ্রামের রবিউল ইসলামের সঙ্গে। বিয়ের পর রবিউল কালীগঞ্জ শহরের বিভিন্ন হোটেলের বাবুর্চির কাজ করতেন। মিম নামে তাঁদের ৬ বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। পরে তহমিনার গর্ভে আরও একটি সন্তান এসেছে। গর্ভের সন্তানের বয়স ২ মাস হলে পাষণ্ড স্বামী রবিউল অন্য এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করে তাঁকে ফেলে অন্যত্র চলে গেছেন। স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। এখন একদিকে নিজের অসুস্থ শরীর। আর ঘরে শয্যাশায়ী অসুস্থ বাবা। বৃদ্ধা মায়ের হাড়ভাঙা পরিশ্রম, এর মধ্যে আবার সিজারের টাকা জোগাড় করা খুবই অসম্ভব ব্যাপার ছিল। এমন অবস্থায় শ্বশুর বারবার সন্তান বিক্রির নিষ্ঠুর প্রস্তাব দিয়েছেন। সামর্থ্য না থাকায় যে প্রস্তাবে রাজিও হতে হয়েছে। পরে সাংবাদিকদের স্মরনাপন্ন হয়ে বুকের ধনকে আর অন্যদের হাতে দিতে হলো না। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা নেই।
অসহায় তহমিনার মা আম্বিয়া বেগম জানান, ‘নিজে বৃদ্ধা বয়সে পরিশ্রম করি। কাপড় নিয়ে গ্রাম গ্রাম ঘুরে আমাদের খাবারই জোগাড় করতে পারি না। সেখানে মেয়ের সিজারের খরচ দেওয়া সম্ভব ছিল না। এদিকে টাকার জন্য নবজাতককে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার নিষ্ঠুর পরিকল্পনা সাংবাদিক বাবারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে রুঁখে দিয়েছেন। আমি সবার কাছে চিরঋণী।’
কালীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি জামির হোসেন জানান, ‘প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা অনেক অর্থশালী নয়। তারপরও টাকার জন্য তহমিনা গর্ভের সন্তান বিক্রি করবেন, এটা শুনে সাংবাদিকরা সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। আমাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় ফারিয়াও।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা করেছি সমাজের একজন মানুষ হিসেবে মানুষের জন্য করেছি।’
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডাক্তার এম এ কাফি জানান, ‘সিজারের পরে মা ও শিশু দুজনই ভালো আছেন। টাকার অভাবে সন্তান বিক্রি করতে চাওয়া মা তহমিনার সিজার আমি নিজ হাতে করতে পেরে ভালো লাগছে।’ তিনি বলেন, এমন অসহায় মানুষের জন্য স্থানীয় কালীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাংবাদিক ভাইদের সহযোগিতা মনে রাখার মতো।
কমেন্ট বক্স