শীত উপেক্ষা করে টানা ২২ দিন রাস্তায়
- আপলোড তারিখঃ
২৮-১২-২০১৯
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার জন্য গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে চাকরিপ্রত্যাশীরা। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে সংসদেও। কিন্তু বয়সবৃদ্ধির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। উপরন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বিদ্যমান বয়সসীমা কোনোভাবেই বৃদ্ধি করা যাবে না। কিন্তু বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না বয়সবৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীরা। প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে একই দাবিতে গত ২২ দিন ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে আন্দোলনকারীরা। এরমধ্যে শেষ ১০ দিন চলছে আমরণ অনশন কর্মসূচি। টানা আন্দোলনে অংশ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বেশ কয়েকজন। এরমধ্যে নারীসহ ৫ আন্দোলনকারী বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। টানা ২২ দিন ধরে আন্দোলন চললেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। তারা বলছে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ৩৫-র যৌক্তিকতা তুলে ধরেছি। এরপরও সরকার আমাদের ব্যাপারে উদাসীন। তারা প্রশ্ন রেখে বলেন, ৩৫ বছর বয়সের জন্য আর কতদিন এভাবে খেয়ে না খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে হবে।
জানা যায়, বয়সবৃদ্ধির দাবিতে চলতি মাসের ৬ তারিখ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণঅনশন শুরু করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্রকল্যাণ পরিষদ নামের একটি সংগঠন। অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছে তার। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড শীত-কুয়াশার প্রকোপ থাকলেও তা উপেক্ষা করেই কর্মসূচি পালন করছে তার। আন্দোলনকারীরা বলছেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহার অনুসারে ৩৫ দাবিটি অন্তর্ভুক্ত করে পুনরায় ৪১তম বিসিএসের সার্কুলার দিতে হবে। এছাড়া বয়স ৩৫ বছর করাসহ ৪ দফা দাবি মেনে নেয়ার লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎও চেয়েছেন তারা। তাদের দাবিগুলো হলো— চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর করতে হবে, অমানবিক আবেদন ফি কমিয়ে ৫০-১০০ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করতে হবে, নিয়োগ পরীক্ষাগুলো জেলা কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ে নিতে হবে এবং ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়ণন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই দাবিতে গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ নামের অন্য একটি সংগঠন। তারাও কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্রকল্যাণ পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মুজাম্মেল মিয়াজী বলেন, সরকারের কাছে আমরা বারবার আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। তবুও হাল ছাড়িনি। আমরা কর্মসূচি চালিয়ে যাবো। আশা করছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবিগুলো মেনে নেবেন। তিনি আরও বলেন, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি শিগগিরই আমাদের বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বসবেন। রমনা থানা পুলিশও এমন ইঙ্গিত দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানায়, দাবি আদায়ের জন্য শুরুতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলেও পর্যায়ক্রমে সার্টিফিকেট পোড়ানোর কর্মসূচি এবং গণঅনশন কর্মসূচি পালন করা হয়। শেষ পর্যন্ত দাবি আদায়ের জন্য আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করা হয়। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মোমবাতি প্রজ্বলন করেছেন তারা। তারা জানায়, শীতের মধ্যে টানা ২২ দিনের কর্মসূচিতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে ৫ জন বেশি অসুস্থ। তারা হলেন, সুরাইয়া ইয়াসমিন, মোশারফ সোহেল, মুসাদ্দেল আলী রাসেল ও রেশমা আক্তার। আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সুরাইয়া ইয়াসমিন গুরুতর অসুস্থ। অসুস্থদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। স্যালাইন লাগিয়েও আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা গেছে বেশ কজনকে। এছাড়াও উজ্জল সরকার, নাজিম উদ্দিন, সজীব আহমেদ, পারভেজুর রহমান, মাসুম বিল্লাহ্, উজ্জল কুমার বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন।
আন্দোলনকারীরা বলেন, লাখ লাখ শিক্ষার্থী প্রাণের দাবি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির দাবিতে গত আট বছর যাবত আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু তার সুফল পায়নি। ২০১২ সালের সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা দুবছর বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু তার পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা হয়নি। ফলে প্রতিবছর সরকারি চাকরিতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয়নি। এ কারণে শিক্ষার্থীরা দুই বছর পিছিয়ে যায়। তখন সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে, এখন গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা প্রশ্ন রেখে বলেন, তাহলে শুধু কি সরকারি চাকরিজীবীদের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের বৃদ্ধি পায়নি? তাছাড়া ২০০১ সালে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য স্নাতক ডিগ্রি ২ বছর থেকে তিন বছর এবং সম্মান ডিগ্রি তিন বছর থেকে চার বছর করা হয়। কিন্তু চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি করা হয়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সরকারি নীতি অনুসরণ করার ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ৩০ ঊর্ধ্বদের নিয়োগ দেয় না। সেক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর অঙ্গীকার করে। কিন্তু প্রায় এক বছর হয়ে গেছে তার কোনো বাস্তবায়ন আমরা দেখতে পাইনি। চাকরিতে প্রবেশের বয়সবৃদ্ধির দাবিতে প্রায় শুরু থেকেই আন্দোলন করছেন এমন একজন জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আন্দোলন করলেও সরকার কেনো আমাদের দাবি মেনে নিচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। এদেশে আন্দোলন ছাড়া কিছু হয় না। এখন দেখছি আন্দোলন করেও দাবি আদায় হবে না। এখন হয়তো সেশেনজট কিছু কম। কিন্তু আমরা যখন লেখাপড়া শেষ করেছি তখন প্রচণ্ড সেশনজট ছিলো। অনেকের অনার্স শেষ করতে ২৮ বছরও লেগে গেছে। এ অবস্থায় চাকরিতে প্রবেশের বয়স যদি ৩০ বছরই রাখা হয়; তাহলে নিশ্চিত আমাদের বঞ্চিত করা হবে। আন্দোলনকারীরা জানায়, বর্তমান বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১৬২টির বেশি দেশে চাকরিতে বয়সসীমা ৩৫ বা তদূর্ধ্ব। আর অনেক দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নেই। এ অবস্থায় সরকারের উচিত চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার প্রস্তাবটি ওঠে। তবে সরকার তা নাকচ করে দেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। প্রস্তাবটি সংসদে বাতিল হওয়ায় কর্মসূচি পালন করে আন্দোলনকারীরা। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হবে না।
কমেন্ট বক্স