আলমডাঙ্গার গড়চাপড়া পূর্বপাড়ার বৃদ্ধা উজির শাহ’র ঝুপড়ি ঘরে গভীর রাতে নৃশংসতা
ঘটনাস্থল থেকে ফিরে এসএম শাফায়েত: গ্রামজুড়ে রটানো গুজবই অবশেষে সত্যি হলো। নিখোঁজের ১০ ঘন্টার মাথায় উদ্ধার করা হলো আলমডাঙ্গার মুন্সীগঞ্জ গড়চাপড়া পূর্বপাড়ার বাবর আলী ওরফে বাবুর (৫৫) ক্ষতবিক্ষত লাশ। গত বুধবার রাতে গ্রাম থেকে নিখোঁজের পর খুনের খবর রটে গোটা এলাকাজুড়ে। রাতেই জেলা গোয়েন্দা শাখা ও আলমডাঙ্গা থানা পুলিশের দু’টি দলসহ গ্রামবাসী হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে থাকে। তবে সারারাতেও তার ও তার লাশের সন্ধান না মেলাতে পেরে নিছক গুজব বলে এড়িয়ে যায় সকলে। অবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে নিখোঁজ বাবুর ক্ষতবিক্ষত রক্তাত্ব লাশ উদ্ধার করা হয় গড়চাপড়া পূর্বপাড়ার মাঠের ধারে অবস্থিত বৃদ্ধা উজির শাহ’র (৮০) ঝুপড়ি ঘর থেকে। পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। দুপুর নাগাদ ময়নাতদন্ত শেষে বিকাল ৪টায় নিহতের নিজ গ্রামের স্কুল মাঠে জানাযা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়। তবে এ হত্যাকান্ডের প্রকৃত কারণ এখনও জানা সম্ভব হয়নি। পরিবারের দাবি পূর্ব শক্রতার জের ধরে গ্রামেরই একটি পক্ষ প্রতিশোধমূলক তাকে হত্যা করেছে। নিহতের পরিবারের দাবির সাথে একমত পোষণ করেছে পুলিশও। এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কোন মামলা রেকর্ড না করা হলেও অভিযুক্ততা সন্দেহে আলমডাঙ্গা জেহালার গড়চাপড়া পূর্বপাড়ার মৃত গণি মন্ডলের ছেলে হালিম মন্ডল (৫০) ও তার ছেলে সোহেল মন্ডলকে (২৫) আটক করা হয়েছে। তবে হালিম মন্ডলকে শুধুমাত্র জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ। বাকী আসামীদের ধরতে পুলিশি অভিযান অব্যহত রয়েছে। গত পরশু বুধবার বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয় বাবু। সন্ধ্যায় বাড়ির অদূরে তামাক ঘরে তামাক জ্বাল দি`িলেন তিনি। এরপর শেষ বার তাকে এলাকার চায়ের দোকানে দেখা যায়। এসময় থেকে বাবু হঠাৎ নিখোঁজ হয়। গ্রামবাসীর সন্দেহ হলে গ্রামজুড়ে খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়- বাবুকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাকে কেটে তিন টুকরা করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজের ঘটনা পুলিশকে জানালে পুলিশ গড়চাপড়া গ্রামের সব জায়গায় নিখোঁজ বাবুকে উদ্ধারের অব্যহত চেষ্টা চালায়। সর্বশেষ রাত আড়াইটার দিকে আলমডাঙ্গা থানার ডিউটি অফিসারের নিকট গড়চাপড়াসহ আশপাশ এলাকায় কোন লাশ পাওয়া কিম্বা বাবু নামের কারো সন্ধান পাওয়া গেছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিউটি অফিসার বলেন, ওসি স্যারসহ আলমডাঙ্গার একটি টিম গড়চাপড়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পুলিশি অভিযান চলছে। তাছাড়া আদৌ বাবু নামের কেউ খুন বা নিখোঁজ হয়েছে কিনা? সে বিষয়ে আমরা কোন সত্যতা পায়নি। পরদিন (গতকাল) বৃহস্পতিবার ভোরে ফজরের নামাজ শেষে মুসুল্লিরাসহ গ্রামবাসী আবারো বাবুকে খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে গ্রামের পূর্বপাড়া মাঠের ধারে মেহগনি বাগানের মধ্যে বৃদ্ধা উজির শাহ’র (টিনশেড-চাটাইয়ের বেড়া) ঝুপড়ি ঘরে বাবুর ক্ষতবিক্ষত লাশের সন্ধান মেলে। এলাকাবাসী জানায়, গত বুধবার রাতে বাবু বাড়ির পার্শ্ববর্তী হাসিয়ারের চায়ের দোকানে চা পান করে বাড়ির পাশের তামাক চুলায় জ্বাল দিচ্ছিলো। এসময় ৪-৫ জন অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত তাকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করে। প্রাণ বাঁচাতে একই গ্রামের উজির আলী শাহের বাড়ির বসত ঘরের মধ্যে আশ্রয় নেয় বাবু। সেখানে ঢুকে হত্যাকারীরা উপর্যপুরি কুপিয়ে হত্যা করে তাকে। খবর পেয়ে থানা পুলিশ বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরন করে। উজির শাহ জানান, গড়চাপড়া গ্রামের মৃত শুকুর আলীর ছেলে বাবু দীর্ঘদিন যাবত কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে সংযুক্ত ছিল। বুধবার রাত ৮টার দিকে অজ্ঞাত তিনজন ঘরে ভেতর ঢুকে বাবুকে উপর্যপুরি কোপাতে থাকে। এসময় তিনি ঘরে শুয়ে থাকা অবস্থা থেকে উঠলে এক দুর্র্বৃত্ত তার গলায় দেশীয় অস্ত্র ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে এই ঘটনা কাউকে জানাতে নিষেধ করে। বাবুর রক্তে সারা ঘর ভিজে গেলেও তারা বাবুকে মৃত্যুর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত কোপাতে থাকে। পরে দুর্বৃত্তরা চলে গেলে উজির শাহ ঘর থেকে বের হয়ে একই গ্রামের তার ভাই আজিজুলের বাড়িতে অবস্থান নেয়। হত্যাকান্ডের বিষয়টি ক্রমান্নয়ে গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে হত্যাকান্ডের সংবাদ পুলিশের নিকট পৌছায়। পুলিশ রাতেই তার লাশ উদ্ধারের শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে পরদিন সকালে সফলতা পায়। আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জিহাদ ফখরুল আলম খান সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে তার লাশ উদ্ধার করেন। নিহতের স্ত্রী মমতাজ বেগম জানান, বুধবার সন্ধ্যায় বাবু চা পান করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর সে আর বাড়ি ফেরেনি। ভোররাতে জানতে পারি তার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কারো সাথে শক্রতা ছিল কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গনি মন্ডলের পরিবারের সাথে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছিল। আজ থেকে ৪-৫ বছর আগে গনি মন্ডলের নাতি আব্দুল হান্নানের বড় ছেলে জামানকে কে বা কারা অপহরণ করে হত্যা করে। এ হত্যাকান্ডে জড়িত সন্দেহে আমার স্বামীকে প্রধান আসামী করে একটি হত্যা মামলা করা হয়। ওই মামলায় জেল খেটে বাড়ি ফেরে সে। আদালতের মাধ্যমে ঘটনাটি নিষ্পত্তির আগেই তাকে হত্যা করা হলো।’ এ ঘটনায় গণি মন্ডলের ছেলে হালিম মন্ডলসহ তার ছেলেরা ও তাদের পরিবারের লোকজন জড়িত। তারাই এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বলে জানানো হয়। আলমডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জিহাদ ফখরুল আলম খান বলেন, ‘নিহতের পরিবারের ভাষ্যনুযায়ী গনি মন্ডল ও বাবুর পরিবারের সাথে দীর্ঘ দিনের বিরোধ চলে আসছিল। বিরোধের কারণ- বিগত ৫ বছর আগে গণি মন্ডলের নাতি আব্দুল হান্নানের বড় ছেলে জামান মন্ডলকে অপহরণসহ হত্যা করা হয়। বিরোধের কারণেই জামানকে হত্যা করা হয়েছে এমন সন্দেহে বাবুকে প্রধান আসামী করে সে সময় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় আসামী করার পর দীর্ঘদিন আত্মগোপণেও ছিল বাবু। সর্বশেষ সে আদালতে আত্মসমর্পণ করলে এখনও পর্যন্ত মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে এবং এ মামলায় জেল খেটে জামিনও পায় বাবু। তবে প্রকৃতই বাবু চরমপন্থীদের সাথে যুক্ত ছিল এর প্রমাণ আছে। ২০১০ সালে একটি ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই, অস্ত্র মামলাসহ তার বিরুদ্ধে ৫টিরও বেশি মামলা রয়েছে আলমডাঙ্গাসহ বিভিন্ন থানায়। এই বাবুকে হত্যার উদ্দেশ্যে গত বছর দুয়েক আগে আরো একবার আক্রমণ চালিয়ে ছিল হান্নানের ভাই আজিদ, মজিদ ও কামাল। সে সময় তার পেটে ভুজালে ঢুকিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। ওই সময় আক্রমণকারীদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচলেও এবার আর প্রাণেরক্ষা হয়নি বাবুর। গভীর রাতে গ্রামের একটি ঝুপড়ি ঘরে আটকিয়ে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে তার হত্যা নিশ্চিত করা হয়। তবে মূল হত্যাকারীদের এখনও সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মামলার প্রক্রিয়া চলছে।